শিশুর পড়াশোনায় মনোযোগ ধরে রাখার সহজ উপায়

পড়তে বসলে শিশুর মন যেন হাজার জায়গায়। বই খোলা, কিন্তু চোখ জানালার বাইরে, কিংবা দশ মিনিট পরপর “পানি খাব”, “বাথরুম যাব”। বাংলাদেশের বেশিরভাগ বাবা-মায়ের কাছে এটা খুব চেনা দৃশ্য। অনেকে ভাবেন শিশুটা অমনোযোগী বা দুষ্টু। বাস্তবে, ছোট বাচ্চার মস্তিষ্ক একটানা দীর্ঘ সময় ফোকাস ধরে রাখার জন্য তৈরিই নয়। সমাধান জোর করে বেশি সময় বসিয়ে রাখা নয়, বরং পড়ার সময়টাকে ছোট ছোট ভাগে ভাগ করা।
ছোট বিরতির সহজ নিয়ম: ২৫–৩০ মিনিট পড়া, ৫–৭ মিনিট ব্রেক
Chum Wellness-এর সিনিয়র ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্ট Mst. Swampa পরামর্শ দেন, শিশুকে শুরুতে টানা ২৫–৩০ মিনিট পড়তে দিন, এরপর ৫–৭ মিনিটের একটা ছোট বিরতি। এই বিরতিতে মস্তিষ্ক একটু বিশ্রাম পায়, আর পরের ধাপে আবার নতুন করে মন বসে। বড়দের “পোমোডোরো” টেকনিকের এটা শিশু-উপযোগী রূপ।
মূল কথা একটাই, একটানা এক-দেড় ঘণ্টা বসিয়ে রাখলে শেষ দিকে পড়া আর ঢোকে না। ভাগ করে দিলে একই সময়ে অনেক বেশি কাজ হয়।
বিরতি কেন কাজ করে
ছোট বিরতির অভ্যাস শুধু পড়ার জন্য নয়, সন্তানের মানসিক স্বাস্থ্যের জন্যও কাজে লাগে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) তথ্য অনুযায়ী অর্ধেক মানসিক সমস্যার শুরু হয় ১৪ বছর বয়সের মধ্যেই, আর অতিরিক্ত পড়াশোনার চাপ ও ঘুমের ঘাটতি সেই ঝুঁকি বাড়ায়। তাই বিরতি দেওয়া পড়া নষ্ট করা নয়, বরং পড়া টিকিয়ে রাখার উপায়।
মনোযোগেরও একটা “ব্যাটারি” আছে। একটানা কাজ করতে করতে সেটা ফুরিয়ে আসে, মন ক্লান্ত হয়, ভুল বাড়ে, বিরক্তি চলে আসে। ছোট বিরতি সেই ব্যাটারি রিচার্জ করে। শিশুর ক্ষেত্রে এটা আরও জরুরি, কারণ ছোট বয়সে মনোযোগ ধরে রাখার সক্ষমতা স্বাভাবিকভাবেই কম। বিরতির পর সে আবার তুলনামূলক তাজা মন নিয়ে পড়তে পারে।
বয়স অনুযায়ী সময় ঠিক করুন
এই ২৫–৩০ মিনিট কোনো বাঁধাধরা নিয়ম নয়। ছোট বাচ্চা (৫–৭ বছর) হলে হয়তো ১০–১৫ মিনিট পড়েই বিরতি দরকার। একটু বড় (১০–১২ বছর) হলে ৩০–৪০ মিনিটও চলতে পারে। আপনার শিশুর বয়স আর মনোযোগের সক্ষমতা দেখে সময়টা কমান বা বাড়ান। লক্ষ্য একটাই, বিরতিটা এমন সময়ে আসুক যখন সে ক্লান্ত হওয়ার ঠিক আগে থাকে, একদম হাল ছেড়ে দেওয়ার পরে নয়।
বিরতির সময় কী করবে, কী করবে না
বিরতিটা ঠিকভাবে কাজে লাগানোই আসল। ভালো কিছু অভ্যাস:
- একটু হেঁটে আসা বা শরীর নাড়াচাড়া করা
- এক গ্লাস পানি খাওয়া
- হালকা খেলা বা কয়েকটা স্ট্রেচ
- চোখ বন্ধ করে বা দূরে তাকিয়ে চোখকে একটু বিশ্রাম দেওয়া
যেটা এড়িয়ে চলা ভালো, বিরতিতে মোবাইল বা টিভির স্ক্রিন। স্ক্রিন মনকে বিশ্রাম দেয় না, বরং নতুন করে উত্তেজিত করে; পাঁচ মিনিটের ব্রেক তখন সহজেই আধা ঘণ্টা হয়ে যায় আর পড়ায় ফেরা কঠিন হয়ে পড়ে।
পড়ার পরিবেশ আর রুটিনও জরুরি
শুধু বিরতি নয়, আশপাশের পরিবেশও মনোযোগে বড় ভূমিকা রাখে:
- পড়ার জন্য একটা নির্দিষ্ট, শান্ত জায়গা ঠিক করুন, যেখানে টিভির শব্দ বা লোকজনের যাতায়াত কম।
- প্রতিদিন মোটামুটি একই সময়ে পড়তে বসার অভ্যাস করান; রুটিন থাকলে মন নিজে থেকেই পড়ার জন্য প্রস্তুত হয়।
- টেবিলে শুধু দরকারি বই-খাতা রাখুন; অতিরিক্ত জিনিস মনোযোগ ভাঙে।
- একবারে একটা কাজ, একসাথে অনেক বিষয় সামনে থাকলে ছোট মন গুলিয়ে যায়।
Mst. Swampa-র পরামর্শ (ভিডিও)
নিচের ছোট ভিডিওতে বিষয়টা সংক্ষেপে বুঝিয়ে দিয়েছেন Chum Wellness-এর সিনিয়র ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্ট Mst. Swampa:
এক সপ্তাহ চেষ্টা করে দেখুন
যেকোনো নতুন অভ্যাস ধরতে সময় লাগে। অন্তত এক সপ্তাহ এই ছোট-বিরতির পদ্ধতিটা ধৈর্য নিয়ে চালিয়ে দেখুন, কোন ছন্দে (কত মিনিট পড়া, কত মিনিট বিরতি) আপনার শিশুর জন্য সবচেয়ে ভালো কাজ করছে, সেটা কয়েকদিনেই বোঝা যাবে। শিশুকে বকাঝকা না করে বরং ছোট ছোট সাফল্যে উৎসাহ দিন, এতে পড়ার প্রতি ভয় নয়, আগ্রহ তৈরি হয়।
কখন বুঝবেন সমস্যাটা শুধু মনোযোগের নয়
বেশিরভাগ শিশুর ক্ষেত্রে রুটিন আর বিরতি ঠিক করলেই উন্নতি চোখে পড়ে। তবে কিছু ক্ষেত্রে মনোযোগ একেবারেই ধরে রাখতে না পারা, অতিরিক্ত ছটফটে ভাব, কিংবা পড়া নিয়ে চরম উদ্বেগ যদি অনেকদিন ধরে চলতে থাকে, সেটা শুধু “অমনোযোগ” না-ও হতে পারে। এর পেছনে ADHD, উদ্বেগ বা শেখার কোনো নির্দিষ্ট সমস্যা থাকতে পারে। এমন হলে জোরাজুরি না করে একজন ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্টের সঙ্গে কথা বলা ভালো। সঠিক মূল্যায়ন পেলে শিশুর জন্য সঠিক সহায়তা ঠিক করা সহজ হয়। আরও দেখুন: শিশু-কিশোর কাউন্সেলিং।
বাংলাদেশি বাস্তবতা: কেন আমাদের শিশুদের মনোযোগ আরও কঠিন
Chum Wellness-এর শিশু-কিশোর সাইকোলজিস্টদের কাছে অভিভাবকরা যে অভিযোগ নিয়ে সবচেয়ে বেশি আসেন, তার একটি, “পড়তে বসলেই মোবাইল, নাহলে ঘুম।” আমাদের দেশের কিছু বাস্তবতা সমস্যাটাকে আরও কঠিন করে তোলে:
- স্কুল–কোচিং–প্রাইভেটের চাপ: সকাল থেকে রাত টানা ক্লাস; বাসায় ফিরে পড়ার শক্তিই থাকে না। ক্লান্ত মস্তিষ্ক মনোযোগ ধরে রাখতে পারে না।
- মোবাইল ও স্ক্রিন আসক্তি: রিলস আর গেমের দ্রুত-আনন্দে মস্তিষ্ক অভ্যস্ত হয়ে যায়; এরপর ধীরগতির পড়া “বোরিং” লাগে। (আরও পড়ুন: সোশ্যাল মিডিয়া আসক্তি কমানোর উপায়।)
- যৌথ পরিবার ও জায়গার অভাব: আলাদা শান্ত পড়ার ঘর অনেক পরিবারেই নেই, টিভি, অতিথি, ভাইবোনের শব্দে মন ছুটে যায়।
- GPA-5-এর দৌড় আর তুলনা: “অমুকের ছেলে তো…”, অতিরিক্ত চাপ ও তুলনা শিশুর মনে পড়ার প্রতি ভয় তৈরি করে, আগ্রহ নয়।
এগুলো বুঝলে সমাধানও বাস্তব হয়, শুধু “মনোযোগ দাও” বলে ধমক দেওয়ার বদলে পরিবেশ আর অভ্যাসটা বদলানো।
সাধারণ কিছু প্রশ্ন
শিশু পড়তে বসলেই ঘুম পায় কেন?
বেশিরভাগ সময় ক্লান্তি, ঘুমের ঘাটতি বা একঘেয়ে পড়ার ধরন এর কারণ। রুটিন ঠিক করা, পর্যাপ্ত ঘুম আর ছোট বিরতি অনেকটাই সাহায্য করে।
দিনে কত সময় পড়া উচিত?
বয়সভেদে আলাদা। ছোটদের ক্ষেত্রে সময়ের চেয়ে ধারাবাহিকতা বেশি জরুরি, প্রতিদিন অল্প সময় মনোযোগ দিয়ে পড়া, একদিনে অনেকক্ষণ নয়।
মনোযোগের সমস্যা নাকি ADHD, বুঝব কীভাবে?
মাঝেমধ্যে মন না বসা স্বাভাবিক। কিন্তু বয়সের তুলনায় অতিরিক্ত ছটফটে ভাব, কোনো কাজেই টিকতে না পারা বা এটি স্কুল-বাসা সব জায়গায় দীর্ঘদিন ধরে চললে ADHD হতে পারে। নিশ্চিত হতে একজন ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্টের মূল্যায়ন দরকার। (দেখুন: শিশুদের ADHD-র লক্ষণ ও সহায়তা।)
পড়ায় মন বসাতে কি ওষুধ লাগে?
সাধারণত না। রুটিন, পরিবেশ ও অভ্যাসেই বেশিরভাগ শিশুর উন্নতি হয়। নির্দিষ্ট কোনো সমস্যা (যেমন ADHD) ধরা পড়লে তবেই বিশেষজ্ঞ প্রয়োজন অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নেন।
আমাদের সঙ্গে কথা বলুন
শিশুর পড়াশোনা, মনোযোগ বা আচরণ নিয়ে দুশ্চিন্তায় থাকলে একা ভাবতে হবে না। Chum Wellness-এ আছেন শিশু-কিশোরদের মানসিক স্বাস্থ্যে অভিজ্ঞ ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্টরা, অনলাইনে সারা বাংলাদেশ থেকে, অথবা ঢাকায় সরাসরি। সেশন বুক করুন অথবা কল করুন +880 1739-000501।
পরামর্শ দিয়েছেন Mst. Swampa, সিনিয়র ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্ট, Chum Wellness। শিশু-কিশোরদের মানসিক স্বাস্থ্য, পারিবারিক সমস্যা ও সম্পর্ক বিষয়ক কাউন্সেলিংয়ে তাঁর ১৭ বছরের বেশি অভিজ্ঞতা রয়েছে।
Talk to our psychologists
Book a confidential session with a licensed psychologist at Chum Wellness.
See all psychologists →





