রেজাল্ট খারাপ হলে বাচ্চাকে যা বলবেন না, আর যা বলা উচিত

রেজাল্টের দিন ঘরের বাতাসটাই অন্যরকম হয়ে যায়। নম্বর আশানুরূপ না হলে বাবা-মায়ের মুখ ভার, বাচ্চা মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে। এই মুহূর্তে রাগ, হতাশা বা ভয় থেকে আমরা এমন কিছু বলে ফেলি, যা হয়তো এক মিনিটেই ভুলে যাই, কিন্তু বাচ্চা সেটা বছরের পর বছর মনে রাখে।
খারাপ রেজাল্ট নিজে থেকে বাচ্চার ক্ষতি করে না। ক্ষতি করে রেজাল্টের পর সে নিজের সম্পর্কে কী শেখে সেটা। “আমি পারি না”, “আমি বাবা-মায়ের বোঝা”, এই ধারণাগুলো একদিনে তৈরি হয় না, রাগের মাথায় বলা কথা থেকেই ধীরে ধীরে জমে।
রেজাল্ট খারাপ হলে যে কথাগুলো বলবেন না
১. “তুমি তো কিছুই পারো না”
এই একটা কথা বাচ্চার পুরো পরিচয়কে খারাপ বানিয়ে দেয়। একটা পরীক্ষার ফল নিয়ে বলা কথা, কিন্তু বাচ্চা শোনে “আমি মানুষ হিসেবেই অকর্মা”। এতে চেষ্টা করার ইচ্ছাটাই মরে যায়, কারণ সে ধরে নেয় চেষ্টা করেও লাভ নেই।
২. “অমুকের ছেলে/মেয়ে দেখো, কত ভালো করেছে”
তুলনা কখনো অনুপ্রেরণা দেয় না, বরং হিংসা, রাগ আর নিজের প্রতি ঘৃণা তৈরি করে। বাচ্চা তখন পড়াশোনার সাথে অন্যকে হারানোর চাপ জুড়ে ফেলে, শেখার আনন্দ হারিয়ে যায়।
৩. “এত টাকা খরচ করে কী লাভ হলো”
এতে বাচ্চা শেখে যে বাবা-মায়ের ভালোবাসা তার নম্বরের সাথে শর্তযুক্ত। ভালো করলে সে ভালোবাসা পাবে, খারাপ করলে সে একটা “খরচের বোঝা”। এই বোধ বড় হয়ে আত্মমর্যাদার গভীর ক্ষতি করে।
৪. “তোমাকে নিয়ে আর কোনো আশা নেই”
রাগের মাথায় বলা এই কথা বাচ্চার ভেতরে সবচেয়ে বেশি বিপজ্জনক বার্তা পাঠায়, যাকে সবচেয়ে বেশি দরকার সেই মানুষটাই তার ওপর ভরসা হারিয়েছে। এতে হাল ছেড়ে দেওয়ার ঝুঁকি বেড়ে যায়।
৫. পুরনো সব ব্যর্থতা একসাথে টেনে আনা
“গতবারও এই করেছ, তার আগেও…” এভাবে পুরনো সব কথা তুলে আনলে বাচ্চা মনে করে সে চিরকালের ব্যর্থ, বদলানোর কোনো পথ নেই। এক রেজাল্টের কথা এক রেজাল্টেই সীমিত রাখুন।
তাহলে কী বলবেন
উদ্দেশ্য বাচ্চাকে ছাড় দেওয়া নয়, বরং তাকে ভেঙে না ফেলে আবার চেষ্টা করার শক্তি দেওয়া। কয়েকটা সহজ উপায়:
- আগে অনুভূতিটা স্বীকার করুন: “তুমি নিশ্চয়ই মন খারাপ করছ, এটা স্বাভাবিক।” বাচ্চা আগে বুঝুক যে আপনি তার পাশে আছেন, শত্রু নন।
- রেজাল্ট নয়, চেষ্টার কথা বলুন: “কোন জায়গাটা কঠিন লাগল, চলো একসাথে দেখি।” এতে সমস্যা সমাধানের দিকে মন যায়, দোষারোপে নয়।
- পরের ধাপে ফোকাস করুন: “এবার কী করলে সামনে ভালো হবে, একটা প্ল্যান করি।” অতীত বদলানো যায় না, সামনেরটা যায়।
- ভালোবাসা শর্তহীন, এটা বুঝিয়ে দিন: “নম্বর যাই হোক, তুমি আমাদের কাছে সমান গুরুত্বপূর্ণ।” এই একটা বাক্য অনেক ক্ষতি ঠেকিয়ে দেয়।
এখনই চেষ্টা করুন: শিশুর বড় অনুভূতি সামলান
মুহূর্তেই ব্যবহার করার মতো পাঁচটা ধাপ, ইমোশন কোচিং থেকে।
মনে রাখবেন, চাপ শেখায় না, নিরাপত্তা শেখায়
অনেকে ভাবেন কড়া কথা বললে বাচ্চা “শিক্ষা পাবে”। বাস্তবে ভয় আর অপমান শেখার জায়গা কেড়ে নেয়। যে বাচ্চা জানে ভুল করলেও বাসায় নিরাপদ, সে ভুল থেকে শেখার সাহস পায়। যে বাচ্চা প্রতিটা ভুলে বকা খায়, সে ভুল লুকাতে শেখে, শুধরাতে নয়।
রেজাল্টের দিন: বাবা-মায়ের জন্য ছোট একটা পরিকল্পনা
- রেজাল্ট দেখার আগেই ঠিক করুন আপনি শান্ত থাকবেন। নম্বর যাই হোক, প্রথম প্রতিক্রিয়াটাই বাচ্চা সবচেয়ে বেশি মনে রাখে।
- প্রথম বাক্যটা আগে থেকে ভেবে রাখুন: “যা-ই হোক, আমরা তোমার পাশে আছি।”
- আত্মীয়দের প্রশ্ন আপনি সামলান। ফোনে বা সামাজিক অনুষ্ঠানে “কত পেল?” জাতীয় প্রশ্নের জবাব বাচ্চাকে দিতে বাধ্য করবেন না।
- সোশ্যাল মিডিয়ায় অন্যদের রেজাল্টের পোস্ট নিয়ে তুলনা এড়িয়ে চলুন, বাচ্চার সামনে তো নয়ই।
- দিনের বাকিটা স্বাভাবিক রাখুন। একসাথে খাওয়া, হালকা গল্প, বাচ্চা যেন বোঝে রেজাল্ট তার পুরো পরিচয় না।
বড় সন্তানের ক্ষেত্রে: SSC, HSC বা ভর্তি পরীক্ষা
কিশোর বয়সে রেজাল্ট শুধু একটা পরীক্ষার ফল না, অনেকের কাছে পুরো ভবিষ্যতের প্রশ্ন। তাই এ সময় বাবা-মায়ের কাজ হলো সামনে কী কী পথ খোলা আছে, সেটা শান্তভাবে একসাথে দেখা: আবার পরীক্ষা দেওয়া, অন্য বিষয় বা প্রতিষ্ঠান, কারিগরি শিক্ষা, কিংবা এক বছর প্রস্তুতি নিয়ে আবার চেষ্টা। নিজের হতাশা থাকাটা স্বাভাবিক, কিন্তু সেটা সন্তানের সামনে না ঢেলে জীবনসঙ্গী বা কাছের কারও সাথে ভাগ করে নিন। পরীক্ষার চাপ নিয়ে আরও পড়ুন পরীক্ষার চাপ কমানোর উপায়।
যে সতর্ক সংকেত একদম উপেক্ষা করবেন না
রেজাল্টের পর কিছু কিশোর-কিশোরী এতটাই ভেঙে পড়ে যে নিজের ক্ষতির কথা ভাবতে শুরু করে। নিচের যেকোনো একটা দেখলে গুরুত্ব দিন:
- “আমার বেঁচে থেকে কী লাভ” বা “আমি না থাকলেই ভালো” জাতীয় কথা বলা।
- নিজের প্রিয় জিনিস অন্যদের দিয়ে দেওয়া।
- হঠাৎ সবার থেকে আলাদা হয়ে ঘরে দরজা বন্ধ করে থাকা।
- অনেক কষ্টের পর হঠাৎ অস্বাভাবিক শান্ত হয়ে যাওয়া।
এমন হলে বাচ্চাকে একা রাখবেন না, শান্তভাবে সরাসরি জিজ্ঞেস করুন সে নিজের ক্ষতির কথা ভাবছে কিনা (জিজ্ঞেস করলে ঝুঁকি বাড়ে না, বরং কমে), আর দেরি না করে একজন বিশেষজ্ঞের সাহায্য নিন। বিপদ মনে হলে এখনই ৯৯৯-এ কল করুন বা নিকটস্থ হাসপাতালে যান।
কখন এটা শুধু রেজাল্টের ব্যাপার নয়
খেয়াল করুন যদি রেজাল্টের পর বাচ্চা অনেক দিন ধরে মনমরা থাকে, খাওয়া-ঘুমে বড় বদল আসে, নিজেকে গুটিয়ে নেয়, বা নিজের ক্ষতি করার মতো কথা বলে। এগুলো শুধু “মন খারাপ” নয়, কিশোর বয়সের বিষণ্নতা বা দুশ্চিন্তার লক্ষণ হতে পারে। এমন হলে দেরি না করে সাহায্য নিন।
বিশেষজ্ঞের সাহায্য
পরীক্ষা আর রেজাল্টের চাপ শুধু বাচ্চার নয়, অনেক সময় বাবা-মায়েরও। কীভাবে চাপ না বাড়িয়ে সন্তানকে সাহায্য করবেন, সেটা নিয়ে একজন সাইকোলজিস্টের সাথে কথা বলা কাজে দেয়। Chum Wellness-এ শিশু-কিশোর ও প্যারেন্টিং নিয়ে কাজ করেন এমন সাইকোলজিস্টরা আছেন, যাদের সাথে অনলাইনে বা সরাসরি, গোপনীয়তা রেখে বসতে পারেন।
রেজাল্টের পর সন্তানের মন খারাপ, ভয় বা চুপচাপ থাকা কয়েক সপ্তাহ ধরে চললে ঢাকায় একজন চাইল্ড সাইকোলজিস্টের সঙ্গে কথা বলতে পারেন। অনলাইনেও সেশন নেওয়া যায়।
সাধারণ কিছু প্রশ্ন
রেজাল্ট খারাপ হলে একদম কিছু বলব না?
কথা বলবেন, তবে দোষারোপ নয়। আগে অনুভূতি স্বীকার করুন, তারপর কী করলে সামনে ভালো হবে সেটা একসাথে ঠিক করুন। চুপ থাকা বা অভিমান করে থাকাও বাচ্চাকে চাপে ফেলে।
তুলনা করলে কি বাচ্চা ভালো করার চেষ্টা করে না?
না। তুলনা সাময়িক চাপ দিলেও ভেতরে হিংসা আর হীনমন্যতা তৈরি করে। নিজের গত রেজাল্টের সাথে উন্নতির তুলনা করা অনেক স্বাস্থ্যকর।
রাগের মাথায় বলে ফেললে এখন কী করব?
মাথা ঠান্ডা হলে বাচ্চার কাছে সহজভাবে বলুন, “তখন রাগের মাথায় বলে ফেলেছি, ওটা ঠিক হয়নি।” বাবা-মা ভুল স্বীকার করলে সম্পর্ক দুর্বল হয় না, বরং বাচ্চাও ক্ষমা চাইতে শেখে।
রেজাল্ট খারাপ হলে বাচ্চাকে কীভাবে সান্ত্বনা দেব?
আগে তার অনুভূতিটা মেনে নিন (“মন খারাপ হওয়াটা স্বাভাবিক”), তারপর বুঝিয়ে দিন আপনার ভালোবাসা নম্বরের ওপর নির্ভর করে না। সমাধানের কথা পরে, আগে পাশে থাকা।
রেজাল্টের পর বাচ্চা কারও সাথে কথা বলছে না, কী করব?
জোর না করে কাছে থাকুন, খাবার দিন, ছোট ছোট কথা বলুন। এক-দুই দিনের নীরবতা স্বাভাবিক, কিন্তু কয়েক দিন ধরে চললে বা নিজের ক্ষতির কথা বললে দেরি না করে বিশেষজ্ঞের সাহায্য নিন।
আরও পড়ুন: পরীক্ষার চাপ সামলানোর উপায় এবং বাচ্চার পড়ায় মনোযোগ ধরে রাখার উপায়।
How this article was made
- Written by
- Hazera Khatun, Senior Clinical Psychologist
- Clinical reviewer
- Shaheen Nafisa Siddique, Senior Clinical Psychologist
- Last updated
- October 1, 2026
Every Chum article is written for people in Bangladesh by a Chum psychologist or our editorial team, and clinically reviewed by a certified psychologist or psychiatrist who specialises in its topic. How we review · Report an error
Where to go from here
Three next steps, from lightest to most support.

Psychologists who help with children, teens & parenting
Book a confidential session with a certified psychologist at Chum Wellness.






