পরীক্ষার চাপ ও ভয় সামলানোর উপায়: SSC, HSC ও ভর্তি পরীক্ষার্থীদের জন্য

পরীক্ষার চাপ আমাদের দেশের প্রায় প্রতিটি শিক্ষার্থীর জীবনেরই একটি বাস্তবতা। SSC, HSC কিংবা বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি পরীক্ষার আগে বুক ধড়ফড় করা, ঘুম না আসা, বারবার মনে হওয়া “আমি পারব না” এই অনুভূতিগুলো অস্বাভাবিক কিছু নয়। এই লেখায় আমরা সহজ ভাষায় বোঝার চেষ্টা করব, পরীক্ষার চাপ কেন তৈরি হয়, এটি শরীর ও মনে কী প্রভাব ফেলে এবং কীভাবে এটি সামলানো যায়।
অল্প কিছু দুশ্চিন্তা আসলে আমাদের সজাগ রাখে, পড়াশোনায় মনোযোগ ধরে রাখতে সাহায্য করে। কিন্তু যখন এই চাপ এত বেড়ে যায় যে পড়া মাথায় ঢোকে না, ঘুম ও খাওয়া নষ্ট হয়ে যায়, তখন সেটি আর সহায়ক থাকে না। মানসিক স্বাস্থ্য সম্পর্কে আরও বিস্তারিত জানতে আপনি আমাদের মানসিক স্বাস্থ্য কী লেখাটি পড়ে দেখতে পারেন।
এই লেখাটি আমাদের বড় গাইডের একটি অংশ। পুরো বিষয়টি, চিকিৎসার উপায় আর কোন সাইকোলজিস্ট সাহায্য করতে পারেন, জানতে দেখুন: স্ট্রেস ও বার্নআউটের কাউন্সেলিং।
পরীক্ষার চাপ আসলে কেন তৈরি হয়
পরীক্ষার চাপ শুধু পড়া মনে থাকবে কি না, সেই ভয় থেকে আসে না। বাংলাদেশের সামাজিক প্রেক্ষাপটে এর পেছনে আরও অনেক স্তর কাজ করে। একজন শিক্ষার্থী প্রায়ই বুঝতেই পারে না, তার ভেতরের অস্থিরতার আসল উৎস কোথায়।
- ভালো রেজাল্ট না হলে পরিবারে বা আত্মীয়দের সামনে ছোট হয়ে যাওয়ার ভয়।
- “লোকে কী বলবে” এই চিন্তা এবং প্রতিবেশীর সন্তানের সঙ্গে নিয়মিত তুলনা।
- GPA-5 বা নির্দিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয়ে চান্স না পেলে ভবিষ্যৎ শেষ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা।
- একটানা পড়ার প্রত্যাশা, বিশ্রাম বা খেলাধুলাকে সময় নষ্ট হিসেবে দেখা।
- নিজের প্রতি অতিরিক্ত কঠোরতা এবং প্রতিটি ছোট ভুলকে বড় করে দেখা।
প্রত্যাশার ছাঁচ ও অতিরিক্ত নজরদারির প্রভাব
আমাদের ক্লিনিক্যাল অভিজ্ঞতায় আমরা প্রায়ই দেখি, অনেক শিক্ষার্থীকে যেন একটি নির্দিষ্ট “ফ্যাক্টরি ছাঁচে” ফেলে গড়ে তোলার চেষ্টা করা হয়। সবাইকে একই রকম রেজাল্ট, একই বিষয়, একই ক্যারিয়ারের দিকে ঠেলে দেওয়া হয়। এর সঙ্গে যুক্ত হয় অতিরিক্ত নজরদারি, প্রতি ঘণ্টায় কতটুকু পড়ল, কেন একটু বিশ্রাম নিচ্ছে, এসব নিয়ে বারবার প্রশ্ন। এই ধরনের প্রত্যাশা ও নজরদারি একজন কিশোর-কিশোরীর স্নায়ুতন্ত্রের ওপর দীর্ঘ সময় ধরে অসহনীয় চাপ তৈরি করতে পারে। ভালো রেজাল্টের এই তুলনামূলক সংস্কৃতিতে শিক্ষার্থী নিজের মূল্য শুধু নম্বর দিয়ে মাপতে শিখে ফেলে, যা তার আত্মবিশ্বাসকে ভেতর থেকে দুর্বল করে দেয়।
মনে রাখা দরকার, প্রতিটি শিক্ষার্থীর শেখার গতি, আগ্রহ ও সামর্থ্য আলাদা। একজনের সঙ্গে আরেকজনের তুলনা তাই খুব কমই কাজে আসে, বরং তা ভেতরে ভেতরে হীনম্মন্যতা আর ভয় বাড়িয়ে তোলে। চাপের এই উৎসগুলো চিনতে পারলে সেগুলো সামলানোও অনেকটা সহজ হয়ে যায়।
চাপ শরীর ও মনে কীভাবে প্রকাশ পায়
পরীক্ষার চাপ শুধু মনের ব্যাপার নয়, এটি শরীরেও স্পষ্টভাবে ধরা পড়ে। অভিভাবক হিসেবে এই লক্ষণগুলো চিনে রাখা জরুরি, কারণ শিক্ষার্থী নিজে অনেক সময় মুখ ফুটে কিছু বলতে পারে না।
- ঘুম কমে যাওয়া বা ঘুমাতে ভয় লাগা, রাতভর জেগে থাকা।
- ক্ষুধামন্দা অথবা হঠাৎ বেশি খেয়ে ফেলা।
- মাথাব্যথা, পেটব্যথা, বুক ধড়ফড় করা।
- ছোট বিষয়ে বিরক্তি, কান্না বা রাগ।
- বই খুললেই মন খালি হয়ে যাওয়া, মনোযোগ ধরে রাখতে না পারা।
- মাঝেমধ্যে হঠাৎ তীব্র ভয় বা প্যানিক অ্যাটাক (হঠাৎ প্রচণ্ড ভয় পেয়ে বসা)।
সন্তানের আচরণে এমন পরিবর্তন দেখলে কীভাবে বুঝবেন যে বিষয়টি গভীর হচ্ছে, তা জানতে সন্তানের মানসিক স্বাস্থ্যের লক্ষণ নিয়ে আমাদের লেখাটি সহায়ক হতে পারে।
পরীক্ষার চাপ কমানোর ব্যবহারিক উপায়
পরীক্ষার চাপ পুরোপুরি দূর করা সম্ভব না হলেও, কিছু অভ্যাস এটিকে অনেকটাই সহনীয় পর্যায়ে রাখতে সাহায্য করে। এই অভ্যাসগুলো একদিনে গড়ে ওঠে না, তাই ধীরে ধীরে একটি একটি করে চর্চা করাই ভালো।
পড়ার পরিকল্পনা ছোট ছোট ভাগে ভাগ করা
পুরো সিলেবাস একসঙ্গে ভাবলে মনে হয় পাহাড়ের মতো। বদলে প্রতিদিনের জন্য ছোট, বাস্তবসম্মত লক্ষ্য ঠিক করুন। এক ঘণ্টা পড়ার পর ৫ থেকে ১০ মিনিট বিশ্রাম নিন। এই বিশ্রাম অলসতা নয়, বরং মস্তিষ্ককে তথ্য গুছিয়ে নিতে সাহায্য করে। একটি বড় কাজকে ছোট ছোট ধাপে ভাগ করলে প্রতিটি ধাপ শেষ হওয়ার পর যে স্বস্তি পাওয়া যায়, তা পরবর্তী ধাপের জন্য শক্তি জোগায়।
ঘুম, খাওয়া ও শ্বাস-প্রশ্বাসের যত্ন
রাত জেগে পড়ে পরদিন ক্লান্ত থাকার চেয়ে পর্যাপ্ত ঘুম অনেক বেশি কার্যকর। পরীক্ষার আগে গভীর শ্বাসের একটি সহজ অভ্যাস চেষ্টা করুন: ধীরে ধীরে নাক দিয়ে শ্বাস নিন, কয়েক সেকেন্ড ধরে রাখুন, তারপর আস্তে ছেড়ে দিন। বুক ধড়ফড় বা প্যানিকের মুহূর্তে এটি স্নায়ুতন্ত্রকে শান্ত করতে সাহায্য করে। পাশাপাশি সময়মতো খাওয়া এবং একটু হাঁটাচলা বা হালকা ব্যায়ামও মনকে অনেকটা হালকা রাখে।
নিজের সঙ্গে সদয় ভাষায় কথা বলা
“আমি কিছুই পারি না” এই কথার বদলে নিজেকে বলুন, “আমি চেষ্টা করছি, ধাপে ধাপে এগোচ্ছি।” নিজের প্রতি সহানুভূতিশীল হওয়া মানে দায়িত্ব এড়িয়ে যাওয়া নয়, বরং চাপের মধ্যেও নিজের পাশে দাঁড়ানো। নিজেকে বারবার দোষ দেওয়ার অভ্যাস মন আরও ভারী করে তোলে। মানসিক চাপ কমানোর আরও নানা কৌশল জানতে মানসিক চাপ কমানোর উপায় লেখাটি দেখে নিতে পারেন।
অভিভাবকদের জন্য কিছু কথা
সন্তানের ওপর তুলনা ও নজরদারির চাপ কমিয়ে যদি তাকে “রেজাল্ট যাই হোক, তুমি আমাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ” এই আশ্বাস দেওয়া যায়, তবে তার ভয় অনেকটাই কমে আসে। একটু গল্প করা, পাশে বসে চা খাওয়া, বকা না দিয়ে শোনা এই ছোট বিষয়গুলোই সন্তানের জন্য বড় নিরাপত্তা তৈরি করে। সন্তান যখন বুঝতে পারে যে ভুল করলেও পরিবার তার পাশে থাকবে, তখন সে অনেক বেশি স্বস্তি নিয়ে পড়াশোনায় মন দিতে পারে।
এখনই একটু চেষ্টা করুন
দুই মিনিট লাগবে। একটা ধাপ পড়ুন, তারপর চোখ তুলে করুন।
চারপাশে তাকান। দেখতে পাচ্ছেন এমন পাঁচটা জিনিসের নাম মনে মনে বলুন।
ধীরে ধীরে, তাড়াহুড়ো না করে।
রেডি?
৪ সেকেন্ড শ্বাস নিন · ৪ ধরে রাখুন · ৪ ছাড়ুন · ৪ ধরে রাখুন
কখন psychologist-এর সাথে কথা বলবেন
কিছু লক্ষণ দেখা দিলে বুঝতে হবে যে বিষয়টি নিজে সামলানোর সীমা পেরিয়ে গেছে এবং একজন psychologist-এর support প্রয়োজন।
- টানা কয়েক সপ্তাহ ধরে ঘুম, খাওয়া বা মনোযোগ মারাত্মকভাবে নষ্ট হয়ে থাকা।
- নিজেকে সবার কাছ থেকে গুটিয়ে নেওয়া, কারো সঙ্গে কথা বলতে না চাওয়া।
- ঘন ঘন প্যানিক অ্যাটাক বা তীব্র বিষণ্নতার অনুভূতি।
- নিজের ক্ষতি করার বা “সব শেষ হয়ে গেলে ভালো হতো” এমন চিন্তা মাথায় আসা।
আমাদের ক্লিনিক্যাল অভিজ্ঞতায় আমরা প্রায়ই দেখি, দীর্ঘদিনের অসহনীয় চাপ ও একাকীত্ব থেকে কিছু শিক্ষার্থীর মনে আত্মহত্যার চিন্তা আসতে পারে। এই চিন্তা কোনো দুর্বলতা নয়, এটি একটি সংকেত যে তার এখন সহায়তা দরকার। এমন কিছু টের পেলে বিষয়টি চেপে না রেখে দ্রুত পাশে দাঁড়ান। একজন certified psychologist বা কাউন্সেলরের সঙ্গে কথা বলা এই সময়ে সবচেয়ে নিরাপদ পথ। আমাদের অভিজ্ঞ থেরাপিস্টদের সম্পর্কে জেনে নিতে পারেন।
জরুরি অবস্থায় বা কেউ নিজের ক্ষতি করার কথা ভাবলে দেরি করবেন না। জাতীয় জরুরি নম্বর ৯৯৯-এ কল করুন অথবা নিকটস্থ হাসপাতালের জরুরি বিভাগে যান, এবং একজন certified psychologist-এর সাথে কথা বলুন। সঠিক সময়ে সাহায্য চাওয়া সাহসের কাজ, লজ্জার নয়।
শেষ কথা
পরীক্ষা জীবনের একটি অধ্যায়, পুরো জীবন নয়। একটি রেজাল্ট কখনোই একজন মানুষের সম্পূর্ণ মূল্য নির্ধারণ করতে পারে না। যদি আপনি বা আপনার সন্তান পরীক্ষার চাপ, টেনশন বা ভয়ের সঙ্গে একা লড়াই করে ক্লান্ত হয়ে পড়েন, তবে জেনে রাখুন সাহায্য পাওয়া সম্ভব। Chum Wellness-এ আমাদের certified psychologist ও কাউন্সেলররা গোপনীয়তা বজায় রেখে অনলাইনে সারা বাংলাদেশে এবং সরাসরি ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেট, রাজশাহী ও রংপুরে সেবা দিয়ে থাকেন। সেশন ফি ১,০০০ টাকা থেকে শুরু এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের জন্য অনলাইনে নির্দিষ্ট সাইকোলজিস্টের সাথে সেশন ফি ৬৯৯ টাকা থেকে। প্রয়োজন মনে হলে একটি সেশন বুক করুন এবং নিজের বা প্রিয়জনের মনের যত্ন নিন।
পরীক্ষার ভয় যদি ঘুম, খাওয়া বা পড়াকে আটকে দেয়, একজন চাইল্ড ও টিনএজ সাইকোলজিস্ট শিক্ষার্থী আর বাবা-মা দুজনকেই সাহায্য করতে পারেন, অনলাইনে বা ঢাকায় সামনাসামনি।
আরও পড়ুন: বিসিএস ও চাকরির পরীক্ষার আগে দুশ্চিন্তা: কিভাবে সামলাবেন
সাধারণ জিজ্ঞাসা
পরীক্ষার চাপ কমানোর দ্রুত উপায় কী?
পড়ার পরিকল্পনা ছোট ছোট ভাগে ভাগ করা, পর্যাপ্ত ঘুম, নিয়মিত খাওয়া এবং গভীর শ্বাসের অভ্যাস পরীক্ষার চাপ অনেকটাই কমাতে সাহায্য করে। এক ঘণ্টা পড়ার পর সামান্য বিশ্রাম মস্তিষ্ককে তথ্য গুছিয়ে নিতে সাহায্য করে। বুক ধড়ফড়ের মুহূর্তে ধীরে ধীরে নাক দিয়ে শ্বাস নেওয়া ও ছাড়া স্নায়ুতন্ত্রকে শান্ত করে।
সন্তানের পরীক্ষার ভয় কমাতে অভিভাবক কী করতে পারেন?
তুলনা ও অতিরিক্ত নজরদারি কমিয়ে সন্তানকে আশ্বস্ত করুন যে রেজাল্ট যাই হোক, সে পরিবারের কাছে গুরুত্বপূর্ণ। বকা না দিয়ে তার কথা শোনা, পাশে বসে সময় দেওয়া এবং ঘুম-খাওয়ার যত্ন নেওয়া তার ভয় অনেকটাই কমিয়ে দেয়। আচরণে দীর্ঘস্থায়ী পরিবর্তন দেখলে psychologist-এর সাথে কথা বলুন।
কখন একজন psychologist-এর সাথে কথা বলা উচিত?
টানা কয়েক সপ্তাহ ধরে ঘুম, খাওয়া বা মনোযোগ মারাত্মকভাবে নষ্ট হলে, নিজেকে গুটিয়ে নিলে, ঘন ঘন প্যানিক অ্যাটাক বা তীব্র বিষণ্নতা হলে psychologist-এর সাথে কথা বলা উচিত। নিজের ক্ষতির চিন্তা এলে দেরি না করে জাতীয় জরুরি নম্বর ৯৯৯-এ কল করুন বা নিকটস্থ হাসপাতালের জরুরি বিভাগে যান এবং একজন certified psychologist-এর সাথে কথা বলুন।
পরীক্ষার আগের রাতে ঘুম না এলে কী করব?
পরীক্ষার আগের রাতে ঘুম না আসা খুব সাধারণ একটি অভিজ্ঞতা। শোয়ার অন্তত এক ঘণ্টা আগে বই ও মোবাইল সরিয়ে রাখুন, ধীরে ধীরে গভীর শ্বাসের অভ্যাস করুন এবং মনে জোর করে সব বিষয় আরেকবার ঝালিয়ে নেওয়ার চেষ্টা বন্ধ করুন। ঘুম না এলেও শুয়ে চোখ বন্ধ করে বিশ্রাম নেওয়া শরীর ও মনকে অনেকটাই সতেজ রাখে।
পরীক্ষার চাপ কি স্বাভাবিক, নাকি এটি মানসিক সমস্যা?
পরীক্ষার আগে কিছুটা চাপ ও দুশ্চিন্তা পুরোপুরি স্বাভাবিক এবং তা আমাদের সজাগ রাখে। তবে এই চাপ যখন দীর্ঘদিন ধরে ঘুম, খাওয়া, মনোযোগ ও দৈনন্দিন জীবন মারাত্মকভাবে নষ্ট করে দেয়, তখন সেটি আর কেবল স্বাভাবিক চাপ থাকে না। এমন হলে একজন certified psychologist-এর সাথে কথা বলা ভালো।
How this article was made
- Written by
- Sharmin Akter Shetu, Senior Assistant Psychologist
- Clinical reviewer
- Shaheen Nafisa Siddique, Senior Clinical Psychologist
- Last updated
- October 29, 2026
Every Chum article is written for people in Bangladesh by a Chum psychologist or our editorial team, and clinically reviewed by a certified psychologist or psychiatrist who specialises in its topic. How we review · Report an error
Where to go from here
Three next steps, from lightest to most support.

Psychologists who help with anxiety & stress
Book a confidential session with a certified psychologist at Chum Wellness.






