বাচ্চাদের অতিরিক্ত জেদ কমানোর উপায়: জেদি সন্তান সামলানোর গাইড

খেতে বসলে যুদ্ধ, পড়তে বসালে কান্না, “না” শুনলেই মেঝেতে গড়াগড়ি, জেদি সন্তান বা বাচ্চার অতিরিক্ত জেদ সামলাতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছেন? আপনি একা নন। ভালো খবর হলো: জেদ মানেই “খারাপ বাচ্চা” নয়, জেদ হলো শিশুর অনুভূতি প্রকাশের অপরিণত ভাষা। আর সঠিক কৌশলে বেশিরভাগ জেদই ধাপে ধাপে কমিয়ে আনা যায়।
সংক্ষেপে: বাচ্চাদের অতিরিক্ত জেদ কমানোর ৭টি উপায়
- জেদের সময় নিজে শান্ত থাকুন, গলা নামান।
- অনুভূতির নাম দিন: “বুঝেছি, তুমি রেগে গেছ।”
- কিন্তু জেদ দেখে দাবি মেনে নেবেন না।
- ছোট ছোট পছন্দের সুযোগ দিন: “এখন, নাকি পাঁচ মিনিট পর?”
- ঘুম, খাওয়া আর স্ক্রিন টাইম ঠিক রাখুন।
- ভালো আচরণ করলে সাথে সাথে প্রশংসা করুন।
- মারধর বা চিৎকার নয়; নিয়ম অল্প রাখুন, কিন্তু বাসার সবার জন্য এক।
জেদ যদি খুব ঘন ঘন আর তীব্র হয়, বা ৬–৭ বছরের পরও রোজ থাকে, একজন চাইল্ড সাইকোলজিস্টের সাথে কথা বলুন।
বাচ্চা জেদি হওয়ার কারণ কী?
- ভাষার অভাব: ছোট শিশু রাগ-কষ্ট-ক্লান্তি বোঝাতে পারে না, তাই কান্না আর জেদই তার ভাষা
- মনোযোগের খোঁজ: ব্যস্ত বাবা-মায়ের মনোযোগ পাওয়ার সবচেয়ে নিশ্চিত উপায়, ঝামেলা করা
- সীমানার পরীক্ষা: “কতদূর গেলে কী হয়”, এটা শেখা বড় হওয়ারই অংশ
- অনুকরণ: ঘরে চিৎকার-রাগারাগি দেখলে শিশুও তাই শেখে
- ঘুম, ক্ষুধা, স্ক্রিন: ঘুম কম, ক্ষুধা, বা অতিরিক্ত মোবাইল, জেদের তিন নীরব ইঞ্জিন। পড়ুন: স্ক্রিন টাইম ও শিশুর মানসিক স্বাস্থ্য
জেদের মুহূর্তে যা করবেন
- নিজে শান্ত থাকুন: আপনার চিৎকার শিশুর জেদকে জ্বালানি দেয়। গলা নামান, শিশুও নামাবে।
- অনুভূতিকে নাম দিন: “তুমি রেগে গেছ, কারণ খেলা বন্ধ করতে হচ্ছে, বুঝেছি।” অনুভূতি স্বীকার করলেই অর্ধেক ঝড় থামে।
- কিন্তু দাবিতে অটল থাকুন: সহানুভূতি ≠ আত্মসমর্পণ। জেদের মুখে দাবি মেনে নিলে শিশু শেখে, জেদই কাজের অস্ত্র।
- বিকল্প দিন: “এখন ভাত, নাকি পাঁচ মিনিট পর?”, ছোট পছন্দ শিশুকে নিয়ন্ত্রণের অনুভূতি দেয়।
- জনসমক্ষে দৃশ্য হলে: শান্তভাবে সরিয়ে নিন; মানুষের সামনে শাসন করবেন না।
দীর্ঘমেয়াদে জেদ কমানোর ৫ অভ্যাস
- প্রতিদিন ১৫–২০ মিনিট শিশুর সাথে শুধু তার পছন্দের খেলায় সময় দিন, মোবাইল দূরে রেখে
- ভালো আচরণের প্রশংসা করুন সাথে সাথে, “নিজে খেলনা গুছিয়েছ, দারুণ!”
- রুটিন বানান: ঘুম-খাওয়া-পড়া-খেলার মোটামুটি নির্দিষ্ট সময়
- নিয়ম হোক অল্প, কিন্তু সবার জন্য এক, বাবা “হ্যাঁ”, মা “না” হলে জেদ বাড়বেই
- মারধর নয়: গবেষণা স্পষ্ট, মার জেদ কমায় না, ভয় আর লুকোচুরি বাড়ায়; শারীরিক শাস্তি সময়ের সাথে আচরণের সমস্যা বাড়িয়ে দেয় (WHO)
কখন চাইল্ড সাইকোলজিস্ট দেখাবেন?
নিচের যেকোনোটি হলে একজন চাইল্ড সাইকোলজিস্টের পরামর্শ নিন:
- জেদ এতটাই ঘন ঘন ও তীব্র যে ঘর-স্কুল দুটোই অচল
- নিজেকে বা অন্যকে আঘাত করা (কামড়, মাথা ঠোকা)
- ৬–৭ বছরের পরও প্রতিদিন প্রবল ট্যানট্রাম
- সাথে ঘুম-খাওয়া-মনোযোগের বড় সমস্যা, ADHD-র লক্ষণও হতে পারে: শিশুর ADHD গাইড
কখন-কীভাবে বিস্তারিত: শিশুর জন্য সাইকোলজিস্ট: কখন দরকার। চাম ওয়েলনেসের চাইল্ড সাইকোলজিস্টরা প্লে থেরাপি ও প্যারেন্টিং গাইডেন্স দুটোই দেন, অনলাইনে সারা দেশ থেকে, শিশু-কিশোরদের সেশন ৳১,৫০০ থেকে ৳৩,৫০০ (ফি দেখুন)। ঢাকায় চাইল্ড সাইকোলজিস্ট দেখুন বা সেশন বুক করুন।
যে ৪টি প্রতিক্রিয়া জেদ আরও বাড়িয়ে দেয়
জেদ সামলাতে গিয়ে বাবা-মা প্রায়ই এমন কিছু করেন যা উল্টো জেদ বাড়িয়ে দেয়। এক, চিৎকার বা মারধর, এতে শিশু ভয় পায় কিন্তু শেখে না, বরং জেদ ভেতরে জমে। দুই, একবার না বলে পরে হার মেনে দিয়ে দেওয়া, এতে শিশু শেখে যে কান্না করলেই কাজ হয়। তিন, ভাইবোন বা অন্য শিশুর সাথে তুলনা, যা আত্মবিশ্বাস ভাঙে।
চার, জেদের মুহূর্তে দীর্ঘ বকুনি বা যুক্তি, তখন শিশুর মস্তিষ্ক শোনার অবস্থায় থাকে না। এর বদলে শান্ত থেকে সীমা ধরে রাখা, আর ঠান্ডা হওয়ার পর কথা বলা বেশি কাজে দেয়। বারবার একই সমস্যা হলে একজন চাইল্ড সাইকোলজিস্টের পরামর্শ নেওয়া যেতে পারে।
বয়সভেদে জেদ কীভাবে সামলাবেন
জেদের ধরন আর সামলানোর উপায় বয়সের সাথে বদলায়। টডলার বয়সে (২ থেকে ৪) জেদ মানে প্রায়ই ক্লান্তি, খিদে, বা অনুভূতি প্রকাশ করতে না পারা, তাই মনোযোগ ঘুরিয়ে দেওয়া আর রুটিন ঠিক রাখা সবচেয়ে কাজে দেয়। স্কুল-বয়সে (৫ থেকে ১০) শিশু যুক্তি বোঝে, তাই আগে থেকে স্পষ্ট নিয়ম আর ছোট ছোট পছন্দের সুযোগ (এই জামা নাকি ওই জামা) জেদ কমায়। কিশোর বয়সে জেদের পেছনে থাকে স্বাধীনতার চাহিদা, এখানে জোর নয়, সম্মান আর খোলামেলা আলোচনা বেশি কার্যকর।
যখন জেদ স্বাভাবিক নয়: সতর্ক সংকেত
জেদ বেশির ভাগ সময়ই বয়সের স্বাভাবিক অংশ, কিন্তু কিছু পরিবর্তন খেয়াল রাখা দরকার। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) তথ্য অনুযায়ী অর্ধেক মানসিক সমস্যার শুরু হয় ১৪ বছর বয়সের মধ্যেই, অথচ বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই তা ধরা পড়ে না। তাই আচরণে হঠাৎ বড় বদল, স্কুলে যেতে না চাওয়া বা দীর্ঘদিন ধরে চলা রাগ শুধু “জেদ” ধরে নিয়ে ফেলে রাখা ঠিক নয়।
বেশিরভাগ জেদ বেড়ে ওঠার স্বাভাবিক অংশ। কিন্তু কিছু লক্ষণ দেখলে গুরুত্ব দেওয়া দরকার, যেমন প্রতিদিন দীর্ঘ সময় ধরে রাগের বিস্ফোরণ, নিজেকে বা অন্যকে আঘাত করা, স্কুলে বড় সমস্যা, বা রাগের সাথে ঘুম-খাওয়ায় বড় পরিবর্তন। এগুলো কেবল জেদ না-ও হতে পারে, পেছনে দুশ্চিন্তা, মনোযোগের সমস্যা, বা মানসিক চাপ থাকতে পারে। এমন হলে একজন চাইল্ড সাইকোলজিস্টের পরামর্শ নেওয়াই ভালো। কোন আচরণ কখন আচরণগত সমস্যা (behavioral disorder) হতে পারে, তা বিস্তারিত দেখুন: Behavioral disorders in children: ১৫টি ধরন ও লক্ষণ।
বাচ্চার রাগ কমানোর উপায়
জেদ আর রাগ প্রায়ই একসাথে আসে। জেদ হলো “আমি এটাই চাই”, আর রাগ হলো না পাওয়ার কষ্টের বিস্ফোরণ: চিৎকার, জিনিস ছোড়া, মারতে আসা। বাচ্চার রাগ কমাতে যা কাজ করে:
- রাগের মুহূর্তে কম কথা: লম্বা উপদেশ তখন মাথায় ঢোকে না। শান্ত গলায় ছোট করে বলুন, “আমি আছি। মারা যাবে না।”
- নিরাপত্তা আগে: বাচ্চা মারতে এলে বা জিনিস ছুড়লে শান্তভাবে হাত ধরে থামান, আশেপাশের ভাঙার জিনিস সরিয়ে দিন। পাল্টা মারবেন না।
- শান্ত হওয়ার কোণ: ঘরের একটা কোণে কুশন, প্রিয় বই বা খেলনা রাখুন। রাগ উঠলে সেখানে গিয়ে বসা শেখান, শাস্তি হিসেবে না, শান্ত হওয়ার জায়গা হিসেবে।
- শরীর দিয়ে রাগ নামানো: গভীর শ্বাস (“ফুল শুঁকো, মোমবাতি নেভাও”), বালিশে ঘুষি, দৌড়ানো বা লাফানো।
- পরে কথা বলুন: শান্ত হলে জিজ্ঞেস করুন, “তখন কী হয়েছিল? পরের বার রাগ উঠলে কী করতে পারো?” অনুভূতির নাম শেখান: রাগ, কষ্ট, হিংসা, ভয়।
- নিজের রাগের যত্ন: বাচ্চা দেখে দেখে শেখে। আপনি রেগে চিৎকার করলে সে-ও তাই শিখবে। নিজের রাগ সামলানোর কৌশল পাবেন এখানে: রাগ নিয়ন্ত্রণের বাস্তব উপায়।
মারধর কেন রাগ আর জেদ দুটোই বাড়ায়, আর না মেরে কিভাবে শাসন করবেন, বিস্তারিত পড়ুন বাচ্চাদের মারলে কি হয়। মোবাইল কেড়ে নিলেই রাগ হলে দেখুন বাচ্চাদের মোবাইল আসক্তি কমানোর উপায়। রাগের সময় বাচ্চা যদি নিজেকে বা অন্যকে গুরুতর আঘাত করে, জরুরি অবস্থায় ৯৯৯-এ কল করুন।
আরও পড়ুন: বাচ্চা বিছানায় প্রস্রাব করলে করণীয়: কারণ ও সমাধান
এখনই চেষ্টা করুন: শিশুর বড় অনুভূতি সামলান
মুহূর্তেই ব্যবহার করার মতো পাঁচটা ধাপ, ইমোশন কোচিং থেকে।
সচরাচর জিজ্ঞাসা (FAQ)
বাচ্চাদের অতিরিক্ত জেদ কমানোর উপায় কী?
জেদের মুহূর্তে নিজে শান্ত থাকুন, বাচ্চার অনুভূতির নাম দিন, কিন্তু দাবিতে অটল থাকুন। ছোট ছোট পছন্দের সুযোগ দিন, ভালো আচরণ করলে সাথে সাথে প্রশংসা করুন, আর ঘুম-খাওয়া-স্ক্রিন টাইমের রুটিন ঠিক রাখুন। মারধর বা চিৎকারে জেদ কমে না, বরং বাড়ে।
বাচ্চার রাগ জেদ কমানোর উপায় কি?
রাগের মুহূর্তে নিজে শান্ত থাকুন, কম কথা বলুন আর নিরাপত্তা নিশ্চিত করুন। শান্ত হলে অনুভূতির নাম দিতে আর শ্বাস নেওয়া বা শান্ত কোণে যাওয়ার মতো কৌশল শেখান। ঘুম, খাওয়া আর স্ক্রিন টাইমের রুটিন ঠিক রাখুন, আর মারধর বা চিৎকার এড়িয়ে চলুন।
বাচ্চা জেদি হওয়ার কারণ কী?
বেশিরভাগ সময় বাচ্চা জেদ করে কারণ সে রাগ, কষ্ট বা ক্লান্তি মুখে বোঝাতে পারে না। এর সাথে মনোযোগ পাওয়ার চাওয়া, সীমা পরীক্ষা করা, বাসার পরিবেশ দেখে শেখা, আর কম ঘুম, খিদে বা অতিরিক্ত মোবাইলও জেদ বাড়ায়।
জেদি সন্তানকে শাস্তি দেওয়া কি ঠিক?
মারধর বা কঠোর শাস্তি জেদ কমায় না, ভয় বাড়ায়। তার বদলে পরিণতি-ভিত্তিক নিয়ম (যেমন খেলার সময় কমে যাওয়া) ও ভালো আচরণের পুরস্কার অনেক বেশি কার্যকর।
কোন বয়সের জেদ স্বাভাবিক?
২–৪ বছরে ট্যানট্রাম খুবই স্বাভাবিক। বয়স বাড়ার সাথে কমে আসার কথা; ৬–৭ বছরের পরও প্রতিদিন তীব্র জেদ হলে একজন চাইল্ড সাইকোলজিস্টের পরামর্শ নিন।
জেদের সময় ফোন/চকলেট দিয়ে থামানো কি ক্ষতিকর?
সাময়িক শান্তি, দীর্ঘমেয়াদে বিপদ, শিশু শেখে জেদ করলেই পুরস্কার। এই অভ্যাস ভাঙতেই সবচেয়ে বেশি কষ্ট হয়।
প্যারেন্টিং নিয়ে কি কাউন্সেলিং হয়?
হ্যাঁ, চাইল্ড সাইকোলজিস্টরা শুধু শিশুর সাথে নয়, বাবা-মায়ের সাথেও কাজ করেন। অনেক ক্ষেত্রে প্যারেন্টিং কৌশল বদলালেই জেদ নাটকীয়ভাবে কমে।
সাইকোলজিস্টের সাহায্যের জন্য শিশু কাউন্সেলিং দেখুন, অথবা একটি সেশন বুক করুন।
How this article was made
- Written by
- Sharmin Akter Shetu, Senior Assistant Psychologist
- Clinical reviewer
- Farzana Sultana Nila, Clinical Psychologist
- Last updated
- October 28, 2026
Every Chum article is written for people in Bangladesh by a Chum psychologist or our editorial team, and clinically reviewed by a certified psychologist or psychiatrist who specialises in its topic. How we review · Report an error
Where to go from here
Three next steps, from lightest to most support.

Psychologists who help with children, teens & parenting
Book a confidential session with a certified psychologist at Chum Wellness.






