প্রিয়জনের ডিপ্রেশন হলে কী করবেন: পরিবারের জন্য গাইড

প্রিয়জনের ডিপ্রেশন হলে সবচেয়ে বড় সাহায্য হলো বিচার না করে পাশে থাকা, তাঁর কষ্টটাকে অসুখ হিসেবে মেনে নেওয়া, ধৈর্য ধরে সাইকোলজিস্ট বা সাইকিয়াট্রিস্টের কাছে যেতে উৎসাহ দেওয়া, আর চিকিৎসা চলাকালীন রোজকার ছোট ছোট কাজে সাথে থাকা। “মন শক্ত করো” বা “এত ভাবার কি আছে” বলে ডিপ্রেশন কাটে না। আবার আপনি একা পুরো দায়িত্ব নিয়ে তাঁকে “সারিয়ে তুলবেন”, সেটাও আশা করা ঠিক না। আপনার কাজ পাশে থাকা, চিকিৎসার কাজ চিকিৎসকের।
পরিবারের মানুষেরা প্রায়ই আমাদের এমন কথা বলেন: “আম্মা সারাদিন শুয়ে থাকেন, কিছু জিজ্ঞেস করলে রেগে যান”, “আমার স্বামী আগে কত হাসিখুশি ছিল, এখন কথাই বলে না”, “ছোট ভাই বলে, আমি সবার বোঝা”। কাছের মানুষ এভাবে বদলে গেলে কষ্ট লাগে, ভয়ও লাগে। এই লেখাটা সেই পরিবারগুলোর জন্য।
প্রিয়জনের ডিপ্রেশন কিভাবে চিনবেন
ডিপ্রেশন সবসময় কান্না বা মন খারাপ হিসেবে দেখা যায় না। পরিবারের চোখে যেসব পরিবর্তন সাধারণত পড়ে:
- আগে যেসব কাজে আনন্দ পেতেন, এখন আর আগ্রহ নেই।
- মানুষ এড়িয়ে চলা, ঘরে একা থাকা, ফোন না ধরা।
- অল্পতে রেগে যাওয়া বা খিটখিটে মেজাজ, বিশেষ করে পুরুষদের মধ্যে।
- ঘুম অনেক কমে যাওয়া বা সারাদিন শুয়ে থাকা, খাওয়ায় অরুচি।
- সারাক্ষণ ক্লান্তি, মাথা বা শরীর ব্যথার অভিযোগ।
- “আমাকে দিয়ে কিছু হবে না”, “আমি সবার বোঝা” ধরনের কথা।
এসব দুই সপ্তাহের বেশি থাকলে এটাকে “মেজাজ খারাপ” বা “অলসতা” ভেবে বসে থাকবেন না। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, হালকা, মাঝারি বা তীব্র, সব ধরনের ডিপ্রেশনেরই কার্যকর চিকিৎসা আছে (WHO)। ডিপ্রেশনের লক্ষণ আর কারণ নিয়ে বিস্তারিত জানতে পড়ুন ডিপ্রেশন (বিষণ্নতা) কি, লক্ষণ ও কারণ।
কথা কিভাবে শুরু করবেন
- শান্ত একটা সময় বেছে নিন, যখন আশেপাশে অন্য কেউ নেই আর তাড়াহুড়ো নেই।
- নিজের চোখে যা দেখেছেন, সেটা বলুন, দোষ না দিয়ে: “কয়েক সপ্তাহ ধরে দেখছি তুমি ঠিকমতো ঘুমাচ্ছ না, আমার চিন্তা হচ্ছে।”
- বেশি শুনুন, কম বলুন। সাথে সাথে সমাধান দিতে যাবেন না।
- তাঁর অনুভূতিকে ছোট করবেন না। “তোমার তো সবই আছে, তাও মন খারাপ কেন?” জাতীয় কথা তাঁকে আরও একা করে দেয়।
কেউ হঠাৎ ভেঙে পড়লে সেই মুহূর্তে ঠিক কী বলবেন আর কী বলবেন না, তা নিয়ে আমাদের আলাদা লেখা আছে: প্রিয়জন মানসিকভাবে ভেঙে পড়লে কী বলবেন।
চিকিৎসা নিতে রাজি করাবেন কিভাবে
অনেকে “পাগলের ডাক্তার” দেখানোর ভয়ে বা লজ্জায় রাজি হন না। কয়েকটা জিনিস কাজে দেয়:
- যে সমস্যাটা তিনি নিজে মানেন, সেটা দিয়ে শুরু করুন, যেমন ঘুম না হওয়া বা ক্লান্তি।
- বুঝিয়ে বলুন, সাইকোলজিস্টের কাছে যাওয়া মানে পাগল হওয়া না, যেমন জ্বর হলে ডাক্তার দেখানো স্বাভাবিক।
- অনলাইনে ঘরে বসে কথা বলার সুযোগের কথা বলুন। এতে কেউ দেখে ফেলার ভয় থাকে না।
- অ্যাপয়েন্টমেন্ট নেওয়ার কাজটা আপনি করে দিন, চাইলে প্রথম সেশনে সাথে থাকুন।
- একবারে রাজি না হলে চাপ দেবেন না। কয়েকদিন পর আবার আলতো করে কথা তুলুন।
কাউকে থেরাপিতে উৎসাহ দেওয়া নিয়ে আরও পড়ুন: প্রিয়জনকে থেরাপি নিতে উৎসাহিত করা।
চিকিৎসা চলার সময় পাশে থাকা
- ধৈর্য রাখুন। সেরে ওঠা সোজা পথে হয় না। ভালো দিনের পর খারাপ দিন আসতেই পারে।
- ঔষধ নিয়ে পাহারাদার হবেন না, সহযোগী হোন। সাইকিয়াট্রিস্ট ঔষধ দিলে মনে করিয়ে দিতে পারেন, ফলো-আপে যেতে সাহায্য করতে পারেন। কিন্তু “ভালো তো হয়ে গেছ, এবার ঔষধ বন্ধ করো” কখনো বলবেন না। নিজে থেকে হঠাৎ ঔষধ বন্ধ করা বিপজ্জনক। বিস্তারিত: ডিপ্রেশনের ঔষধ: কখন লাগে।
- ছোট কাজে সাথে থাকুন। একসাথে বিকেলে হাঁটা, একসাথে খাওয়া, ছোট একটা কাজ ভাগ করে করা।
- সংসারের দায়িত্ব কিছুদিন ভাগ করে নিন, কিন্তু তাঁকে পুরোপুরি সব কিছু থেকে সরিয়ে দেবেন না। ছোট দায়িত্ব আত্মবিশ্বাস ফেরাতে সাহায্য করে।
- গোপনীয়তা রাখুন। তাঁর অনুমতি ছাড়া আত্মীয়-প্রতিবেশীকে জানাবেন না।
সেরে ওঠার পথটা সাধারণত কেমন হয়, সেটা বুঝতে আমাদের ইংরেজি গাইড Recovering from depression পড়তে পারেন।
এখনই চেষ্টা করুন: ছোট্ট একটা কাজ
সবকিছু ভারী লাগলে, যতটা ছোট ভাবছেন তার চেয়েও ছোট কিছু দিয়ে শুরু করুন। একটা বেছে নিন।
সম্পর্কভেদে একটু আলাদা কৌশল
- স্বামী বা স্ত্রী: সংসারের ঝগড়া আর ডিপ্রেশন অনেক সময় জট পাকিয়ে যায়। “তুমি বদলে গেছ” না বলে বলুন “তোমাকে কষ্টে দেখছি, আমি পাশে আছি”। টাকা-পয়সা বা বড় সিদ্ধান্তের আলোচনা কিছুদিন হালকা রাখুন, আর দরকারে একসাথে সেশনে যাওয়ার প্রস্তাব দিন।
- বয়স্ক বাবা-মা: তাঁরা “মন খারাপ” না বলে “শরীর ভালো না” বলেন বেশি। ডাক্তারের কাছে নেওয়ার সময় শরীরের পাশাপাশি মনের কথাও তুলুন, আর নিয়মিত ফোন বা দেখা করাকে রুটিন বানান। বিস্তারিত পড়ুন বয়স্ক বাবা-মায়ের মানসিক স্বাস্থ্য।
- কিশোর ছেলেমেয়ে: উপদেশ বা ফোন কেড়ে নেওয়ার চেয়ে আগে সম্পর্কটা ঠিক রাখুন। খিটখিটে মেজাজ আর রেজাল্ট খারাপ হওয়াও ডিপ্রেশনের লক্ষণ হতে পারে। দেখুন টিনএজ ডিপ্রেশন নিয়ে বাবা-মায়ের গাইড (ইংরেজিতে)।
নিজের যত্নও নিন
ডিপ্রেশনে ভোগা কারো দেখাশোনা করা ক্লান্তিকর। আপনার মধ্যেও রাগ, হতাশা, অপরাধবোধ আসতে পারে, এটা স্বাভাবিক। নিজের ঘুম, খাওয়া আর একটু বিশ্রামের সময় রাখুন। আরেকজন বিশ্বস্ত মানুষের সাথে দায়িত্ব ভাগ করুন। দরকার হলে আপনিও একজন সাইকোলজিস্টের সাথে কথা বলুন। নিজে ভেঙে পড়লে প্রিয়জনের পাশে থাকা কঠিন হয়ে যায়।
কখন দেরি না করে জরুরি সাহায্য নেবেন
প্রিয়জন যদি মরে যাওয়ার কথা বলেন, “আমি না থাকলে সবার ভালো হবে” ধরনের কথা বলেন, হঠাৎ জিনিসপত্র বিলিয়ে দিতে থাকেন, বা নিজের ক্ষতি করার চেষ্টা করেন, তাহলে তাঁকে একা রাখবেন না। ঘর থেকে ঝুঁকিপূর্ণ জিনিস, যেমন জমানো ওষুধ বা কীটনাশক, সরিয়ে ফেলুন, আর সাথে সাথে ৯৯৯-এ কল করুন অথবা কাছের হাসপাতালের জরুরি বিভাগে নিয়ে যান।
চাম ওয়েলনেসে লাইসেন্সপ্রাপ্ত সাইকোলজিস্ট আর সাইকিয়াট্রিস্টরা অনলাইনে সারা বাংলাদেশে, আর ঢাকায় সরাসরি, পুরো গোপনীয়তা রেখে কাজ করেন। প্রিয়জনের জন্য বা আপনার নিজের জন্য জানুন আমাদের ডিপ্রেশনের চিকিৎসা ও কাউন্সেলিং সম্পর্কে, অথবা একটা সেশন বুক করুন। বন্ধুর ডিপ্রেশন হলে কী করবেন, তা নিয়ে ইংরেজিতে পড়ুন How to help a friend with depression।
সাধারণ জিজ্ঞাসা
প্রিয়জনের ডিপ্রেশন হলে কি করা উচিত?
বিচার না করে শুনুন, তাঁর কষ্টকে অসুখ হিসেবে মেনে নিন, সাইকোলজিস্ট দেখাতে উৎসাহ দিন আর চিকিৎসার সময় ধৈর্য ধরে পাশে থাকুন। মরে যাওয়ার কথা বললে সাথে সাথে ৯৯৯-এ কল করুন।
প্রিয়জন চিকিৎসা নিতে না চাইলে কী করব?
জোর করবেন না। যে সমস্যা তিনি নিজে মানেন, যেমন ঘুম বা ক্লান্তি, সেটা দিয়ে কথা শুরু করুন, অনলাইনে ঘরে বসে সেশনের কথা বলুন, আর কয়েকদিন পর আবার আলতো করে চেষ্টা করুন।
ডিপ্রেশনে থাকা মানুষকে কী বলা উচিত না?
“মন শক্ত করো”, “তোমার তো সব আছে”, “এগুলো মনের দুর্বলতা” জাতীয় কথা এড়িয়ে চলুন। এগুলো তাঁকে আরও একা আর দোষী মনে করায়।
ঔষধ খেয়ে ভালো লাগলে কি বন্ধ করে দেওয়া যায়?
না, নিজে থেকে হঠাৎ বন্ধ করা যাবে না। ভালো লাগার পরও সাধারণত কয়েক মাস চালিয়ে যেতে হয়। কবে আর কিভাবে কমাবেন, তা সাইকিয়াট্রিস্ট ঠিক করবেন।
আমি নিজেও খুব ক্লান্ত হয়ে পড়ছি, কি করব?
এটা খুব স্বাভাবিক। দায়িত্ব ভাগ করুন, নিজের বিশ্রামের সময় রাখুন, আর দরকার হলে নিজেও একজন সাইকোলজিস্টের সাথে কথা বলুন।
প্রিয়জনের জন্য কি আমি সেশন বুক করে দিতে পারি?
হ্যাঁ। আপনি বুকিং করে দিতে পারেন, তবে সেশনে তাঁর নিজের সম্মতি থাকা জরুরি। সব সেশন সম্পূর্ণ গোপন থাকে।
প্রিয়জন রেগে যান বা খারাপ ব্যবহার করেন, তখন কি করব?
ডিপ্রেশনে খিটখিটে মেজাজ খুব সাধারণ, আর সেটা প্রায়ই সবচেয়ে কাছের মানুষের উপরই পড়ে। কথাগুলো ব্যক্তিগতভাবে না নেওয়ার চেষ্টা করুন, ঝগড়ার মুহূর্তে সরে যান, পরে শান্ত সময়ে কথা বলুন। তবে অসুখ মানে গালাগালি বা গায়ে হাত তোলার অনুমতি না। নিজের নিরাপত্তা আর সীমা ঠিক রাখাও জরুরি।
How this article was made
- Written by
- Chum Wellness editorial team
- Clinically reviewed by
- Mst. Swampa, Senior Clinical Psychologist, BCPS member
- Last updated
- October 7, 2026
Every Chum article is written for people in Bangladesh by a Chum psychologist or our editorial team, and reviewed by a senior clinical psychologist. How we review · Report an error
Where to go from here
Three next steps, from lightest to most support.
Psychologists who help with family issues
Book a confidential session with a licensed psychologist at Chum Wellness.






