গ্যাসলাইটিং (Gaslighting) মানে কি? লক্ষণ, সম্পর্কে প্রভাব ও করণীয়
- গ্যাসলাইটিং মানে কি?
- গ্যাসলাইটিং চেনার উপায়
- গ্যাসলাইটিং-এর কিছু চেনা বাক্য
- সম্পর্কে গ্যাসলাইটিং এর প্রভাব
- চ্যাটে বা মেসেজে গ্যাসলাইটিং
- পরিবার, শ্বশুরবাড়ি আর অফিসে গ্যাসলাইটিং
- গ্যাসলাইটিং নাকি সাধারণ ঝগড়া: পার্থক্য কীভাবে বুঝবেন
- গ্যাসলাইটিং-এর শিকার হলে নিজের মধ্যে যা দেখা যায়
- গ্যাসলাইটিং থেকে নিজেকে কীভাবে রক্ষা করবেন
- কখন একজন সাইকোলজিস্টের সাহায্য নেবেন
- সাধারণ কিছু প্রশ্ন

গ্যাসলাইটিং (Gaslighting) মানে হলো এমন এক ধরনের মানসিক কারসাজি, যেখানে একজন মানুষ ধীরে ধীরে আপনাকে আপনার নিজের স্মৃতি, অনুভূতি আর বিচারবুদ্ধি নিয়েই সন্দেহে ফেলে দেন। বারবার “এমন তো কিছুই হয়নি”, “তুমি ভুল বুঝছ” বা “তুমি বাড়িয়ে বলছ” শুনতে শুনতে আপনি নিজেই ভাবতে শুরু করেন, দোষটা বুঝি আপনারই। বাংলায় একে অনেকটা মন নিয়ে খেলা বা মানসিক ধোঁকা বলা যায়। এই লেখায় সহজ বাংলায় জানবেন গ্যাসলাইটিং মানে কি, এর লক্ষণ কী, সম্পর্কে এর প্রভাব, আর কীভাবে নিজেকে রক্ষা করবেন।
গ্যাসলাইটিং মানে কি?
গ্যাসলাইটিং শব্দটি এসেছে পুরনো একটি নাটক ও সিনেমা “Gas Light” থেকে, যেখানে একজন স্বামী নানা কৌশলে স্ত্রীকে বিশ্বাস করাতে চান যে তিনি পাগল হয়ে যাচ্ছেন। মানসিক স্বাস্থ্যের ভাষায় গ্যাসলাইটিং হলো এমন এক আচরণ, যেখানে কেউ ইচ্ছাকৃতভাবে সত্য ঘুরিয়ে দিয়ে, অস্বীকার করে বা আপনার অনুভূতি ছোট করে দেখিয়ে আপনার ওপর নিয়ন্ত্রণ নিতে চায়। এটা সঙ্গীর সাথে হতে পারে, আবার বাবা-মা, শ্বশুরবাড়ি, বন্ধু বা অফিসের সহকর্মীর সাথেও হতে পারে।
এক কথায় (gaslighting meaning in Bengali): Gaslighting-এর বাংলা অর্থ হলো মানসিক কারসাজি বা মন নিয়ে খেলা, যেখানে কেউ বারবার সত্য অস্বীকার করে আপনাকে নিজের স্মৃতি আর অনুভূতি নিয়ে সন্দেহে ফেলে দেয়। মনোবিজ্ঞানে এটাকে এক ধরনের emotional abuse বা মানসিক নির্যাতন হিসেবে ধরা হয়।
গ্যাসলাইটিং চেনার উপায়
গ্যাসলাইটিং সাধারণত ছোট ছোট আচরণের মধ্য দিয়ে হয়, তাই প্রথমে বোঝা কঠিন। কিছু চেনা লক্ষণ:
- স্পষ্ট ঘটনাও “এমন কিছু বলিনি তো” বলে অস্বীকার করা।
- আপনার কষ্টকে “তুমি বেশি সেন্সিটিভ” বা “তুমি বাড়িয়ে ভাবছ” বলে উড়িয়ে দেওয়া।
- ঘটনা ঘুরিয়ে শেষে আপনাকেই দোষী বানানো।
- আপনার স্মৃতি নিয়ে বারবার সন্দেহ তৈরি করা, যাতে আপনি নিজের ওপর বিশ্বাস হারান।
- ধীরে ধীরে আপনাকে পরিবার বা বন্ধুদের থেকে দূরে সরিয়ে দেওয়া।
- মাঝে মাঝে খুব ভালোবাসা বা প্রশংসা দেখিয়ে, আবার আগের আচরণে ফিরে যাওয়া।
গ্যাসলাইটিং-এর কিছু চেনা বাক্য
গ্যাসলাইটিং প্রায়ই খুব সাধারণ শোনানো কিছু বাক্যের মধ্য দিয়ে হয়। একবার-দুবার শুনলে কিছু মনে হয় না, কিন্তু বারবার শুনতে থাকলে নিজের ওপর ভরসা কমে যায়:
- “তুমি সবকিছু বেশি বোঝো।” আপনার কষ্টকে ছোট করে দেখানো।
- “আমি কখনো এটা বলিনি, তুমি বানিয়ে বলছ।” ঘটে যাওয়া কথাই অস্বীকার করা।
- “তোমার মাথা ঠিক নেই, ডাক্তার দেখাও।” আপনার মানসিক অবস্থা নিয়েই প্রশ্ন তোলা।
- “সবাই তোমার এই স্বভাবের কথা বলে।” অদৃশ্য “সবাই”কে টেনে এনে আপনাকে একা করে দেওয়া।
- “আমি তো মজা করছিলাম, এত সিরিয়াস কেন?” কষ্ট দেওয়ার পর দায় এড়ানো।
- “তুমি না থাকলে এমন হতোই না।” নিজের আচরণের দোষ আপনার ঘাড়ে চাপানো।
সম্পর্কে গ্যাসলাইটিং এর প্রভাব
দীর্ঘদিন গ্যাসলাইটিং এর মধ্যে থাকলে মানুষ ধীরে ধীরে নিজের ওপর বিশ্বাস হারিয়ে ফেলেন। সবসময় মনে হয় নিজের কথা প্রমাণ করতে হবে, ছোট সিদ্ধান্তেও দ্বিধা কাজ করে, আর অকারণে নিজেকে দোষী মনে হয়। এতে আত্মবিশ্বাস কমে যায়, দুশ্চিন্তা বাড়ে, অনেকে বিষণ্নতার মধ্যেও পড়ে যান। এটা মনে রাখা জরুরি, সমস্যাটা আপনার দুর্বলতা নয়। সম্পর্কের এই টানাপোড়েন নিয়ে সাহায্যের জন্য দেখে নিতে পারেন কাপল কাউন্সেলিং, আর আত্মকেন্দ্রিক আচরণ নিয়ে জানতে পড়ুন নার্সিসিস্ট মানে কি।
চ্যাটে বা মেসেজে গ্যাসলাইটিং
আজকাল অনেক গ্যাসলাইটিং হয় মেসেঞ্জার, হোয়াটসঅ্যাপ বা ফোনের মেসেজে। লেখা থাকলেও সেটা কীভাবে ঘুরিয়ে দেওয়া হয়, কিছু চেনা উদাহরণ:
- আগের মেসেজ ডিলিট বা “unsend” করে পরে বলা, “আমি এমন কিছু লিখিনি।”
- স্ক্রিনশট দেখালে উল্টো বলা, “তুমি স্ক্রিনশট জমিয়ে রাখো? তোমার মাথায় সমস্যা আছে।”
- রিপ্লাই না দিয়ে পরে বলা, “মেসেজ তো আসেইনি”, আর আপনাকেই “সন্দেহবাতিক” বলা।
- কষ্ট পাওয়ার কথা লিখলে “lol”, “আবার শুরু করলে?” বা শুধু একটা ইমোজি দিয়ে বিষয়টা ছোট করে দেওয়া।
- গ্রুপ চ্যাটে বা অন্যদের কাছে কথা ঘুরিয়ে বলা, যাতে সবাই ভাবে সমস্যাটা আপনার।
এমন হলে নিরাপদ হলে নিজের জন্য একটা নোট রাখতে পারেন, কবে কী হয়েছিল। এটা কাউকে প্রমাণ দেওয়ার জন্য না, নিজের স্মৃতির ওপর ভরসা ফিরিয়ে আনার জন্য। তবে সঙ্গী যদি আপনার ফোন চেক করেন বা এতে বিপদ বাড়তে পারে, তাহলে আগে নিজের নিরাপত্তার কথা ভাবুন।
পরিবার, শ্বশুরবাড়ি আর অফিসে গ্যাসলাইটিং
- পরিবারে: ছোটবেলার কষ্টের কথা তুললে “এমন কিছুই হয়নি, তুমি অকৃতজ্ঞ” শোনা।
- শ্বশুরবাড়িতে: কোনো অপমানের কথা বললে “তুমি সব ব্যাপারে দোষ খোঁজো” বলে উল্টো আপনাকেই সমস্যা বানানো।
- অফিসে: আপনার দেওয়া আইডিয়া অন্য কেউ নিজের বলে চালিয়ে দিয়ে, প্রশ্ন তুললে “তুমি ভুল মনে রাখছ” বলা।
- বন্ধুত্বে: বারবার কষ্ট দিয়ে “তুমি বড্ড touchy” বলে কথা শেষ করে দেওয়া।
গ্যাসলাইটিং নাকি সাধারণ ঝগড়া: পার্থক্য কীভাবে বুঝবেন
সব মতের অমিলই গ্যাসলাইটিং নয়। দুজন মানুষের একই ঘটনা আলাদাভাবে মনে থাকতেই পারে। পার্থক্যটা হলো ধরনে:
- সাধারণ ঝগড়ায় দুজনেই নিজের কথা বলেন, পরে কেউ ভুল মেনে নেন বা মাঝামাঝি একটা জায়গায় আসেন।
- গ্যাসলাইটিং-এ একজন বারবার আপনার বাস্তবতাকেই অস্বীকার করেন, আর প্রতিবার শেষে আপনিই “সরি” বলেন।
- সাধারণ ঝগড়ার পর আপনি রাগ বা মন খারাপ অনুভব করেন, কিন্তু নিজের স্মৃতি নিয়ে সন্দেহ করেন না।
- গ্যাসলাইটিং-এর পর মনে হয়, “আমিই বুঝি ভুল মনে রাখছি”, আর নিজের ওপর ভরসা কমতে থাকে।
গ্যাসলাইটিং-এর শিকার হলে নিজের মধ্যে যা দেখা যায়
- ছোটখাটো বিষয়েও বারবার সরি বলা।
- কোনো কিছু বলার আগে ভাবা, “ও আবার রাগ করবে না তো?”
- নিজের স্মৃতি আর বিচারবুদ্ধিতে ভরসা না পাওয়া।
- বন্ধুদের কাছে পুরো ব্যাপারটা বোঝাতে না পারা, বা তাঁদের কাছে ওই মানুষটার হয়ে কথা বলা।
- মনে হওয়া, “আমি বুঝি পাগল হয়ে যাচ্ছি”, অথচ সবসময় কী যেন ঠিক নেই এমন অনুভূতি।
গ্যাসলাইটিং থেকে নিজেকে কীভাবে রক্ষা করবেন
- ঘটনা লিখে রাখুন। কী হয়েছিল তা নোট করে রাখলে পরে নিজের স্মৃতি নিয়ে সন্দেহে পড়বেন না।
- বিশ্বস্ত কারো সাথে শেয়ার করুন। বাইরের একটা দৃষ্টিভঙ্গি বাস্তবতা যাচাই করতে সাহায্য করে।
- নিজের অনুভূতিকে ছোট করবেন না। আপনি যা অনুভব করছেন, সেটা আসল।
- স্পষ্ট সীমা (boundary) রাখুন। কোন কথা বা আচরণ আপনি মেনে নেবেন না, তা ঠিক করুন।
- প্রয়োজনে দূরত্ব বজায় রাখুন। কিছু সম্পর্কে নিজেকে বাঁচানোই সবচেয়ে সুস্থ সিদ্ধান্ত।
কখন একজন সাইকোলজিস্টের সাহায্য নেবেন
যদি এমন কোনো সম্পর্ক আপনার আত্মবিশ্বাস, ঘুম বা দৈনন্দিন জীবন নষ্ট করে দিচ্ছে, তাহলে একা সব সামলানোর দরকার নেই। একজন সাইকোলজিস্ট আপনাকে নিজের অনুভূতিতে আবার আস্থা ফিরে পেতে, সীমা তৈরি করতে আর এই চাপ সামলাতে সাহায্য করতে পারেন। চাম ওয়েলনেসে লাইসেন্সপ্রাপ্ত সাইকোলজিস্টদের সাথে অনলাইনে সারা বাংলাদেশ থেকে বা ঢাকায় সরাসরি কথা বলতে পারেন, অথবা সরাসরি একটি সেশন বুক করতে পারেন।
সাধারণ কিছু প্রশ্ন
গ্যাসলাইটিং কি শুধু প্রেমের সম্পর্কে হয়?
না। গ্যাসলাইটিং সঙ্গীর সাথে যেমন হয়, তেমনি বাবা-মা, শ্বশুরবাড়ি, বন্ধু, এমনকি অফিসের সহকর্মী বা বসের সাথেও হতে পারে।
গ্যাসলাইটিং কি সবসময় ইচ্ছাকৃত?
সবসময় নয়। কেউ কেউ সচেতনভাবে নিয়ন্ত্রণ নিতে এটা করে, আবার কেউ নিজের অভ্যাস থেকেই করে ফেলে। কারণ যা-ই হোক, আপনার ওপর এর প্রভাব সত্যিকারের, তাই সেটাকে গুরুত্ব দেওয়া জরুরি।
গ্যাসলাইটিং থেকে কি বেরিয়ে আসা যায়?
যায়। সীমা তৈরি করা, বিশ্বস্ত মানুষের সমর্থন আর প্রয়োজনে একজন কাউন্সেলরের সাহায্য নিয়ে অনেকেই আবার নিজের ওপর আস্থা ফিরে পান।
গ্যাসলাইটিং-এর বাংলা অর্থ কী?
Gaslighting-এর বাংলা অর্থ হলো মানসিক কারসাজি বা মন নিয়ে খেলা। কেউ ইচ্ছা করে বা অভ্যাসবশে সত্য অস্বীকার করে আপনাকে নিজের স্মৃতি, অনুভূতি আর বিচারবুদ্ধি নিয়ে সন্দেহে ফেলে দিলে সেটাকেই গ্যাসলাইটিং বলে।
গ্যাসলাইটিং কি মানসিক নির্যাতন?
হ্যাঁ। দীর্ঘদিন ধরে চললে গ্যাসলাইটিংকে emotional abuse বা মানসিক নির্যাতনের একটা রূপ হিসেবে ধরা হয়, কারণ এতে একজন মানুষ ধীরে ধীরে নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ আর আত্মবিশ্বাস হারিয়ে ফেলেন।
কেউ আমাকে গ্যাসলাইট করছে কিনা কীভাবে বুঝব?
যদি প্রায়ই মনে হয় নিজের স্মৃতি ভুল, সব ঝগড়ার শেষে আপনিই দোষী হন, আর কারও সঙ্গে কথা বলার আগে ভয় বা দ্বিধা লাগে, তাহলে সম্পর্কটা নিয়ে ভাবার সময় এসেছে। ঘটনাগুলো লিখে রাখলে আর বিশ্বস্ত কারও সঙ্গে শেয়ার করলে পরিষ্কার বোঝা যায়।
জরুরি অবস্থা: আপনি যদি নিজের বা কারও ক্ষতির ঝুঁকিতে থাকেন, জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এ কল করুন। কাউন্সেলিং জরুরি সেবার বিকল্প নয়।
How this article was made
- Written by
- Farzana Sultana Nila, Clinical Psychologist
- Clinically reviewed by
- Mst. Swampa, Senior Clinical Psychologist, BCPS member
- Last updated
- October 6, 2026
Every Chum article is written for people in Bangladesh by a Chum psychologist or our editorial team, and reviewed by a senior clinical psychologist. How we review · Report an error
Where to go from here
Three next steps, from lightest to most support.

Psychologists who help with relationships & marriage
Book a confidential session with a licensed psychologist at Chum Wellness.






