দাম্পত্য কলহ কেন হয় এবং কীভাবে মেটাবেন

দাম্পত্য কলহ প্রায় প্রতিটি সম্পর্কেই কমবেশি দেখা যায়, আর এটি নিয়ে লজ্জিত বা অপরাধী বোধ করার কিছু নেই। দুজন আলাদা মানুষ, আলাদা পরিবার আর আলাদা অভ্যাস নিয়ে যখন একসাথে জীবন শুরু করেন, তখন মতের অমিল হওয়াটাই স্বাভাবিক। আসল প্রশ্ন হলো, এই দাম্পত্য কলহ কেন বারবার ফিরে আসে এবং কীভাবে তা সুস্থভাবে মেটানো যায়।
এই লেখায় আমরা সহজ ভাষায় বোঝার চেষ্টা করব ঝগড়ার পেছনের প্রকৃত কারণগুলো, বাংলাদেশি পরিবারের বাস্তবতা মাথায় রেখে, এবং কীভাবে ধীরে ধীরে দুজনের মধ্যে বোঝাপড়া ও ঘনিষ্ঠতা ফিরিয়ে আনা যায়।
দাম্পত্য কলহ আসলে কী
দাম্পত্য কলহ মানে সবসময় বড় কোনো ঝগড়া নয়। অনেক সময় এটি চুপচাপ দূরত্ব, একে অপরের প্রতি বিরক্তি, কিংবা ছোট ছোট বিষয়ে বারবার তর্কের রূপ নেয়। কেউ কেউ চিৎকার করে ঝগড়া করেন, আবার কেউ কথা বন্ধ করে দিয়ে নীরবে দূরে সরে যান। দুটোই সম্পর্কের ওপর চাপ ফেলে।
মনে রাখা জরুরি, মতভেদ থাকা মানেই সম্পর্ক খারাপ নয়। বরং সেই মতভেদ কীভাবে সামলানো হচ্ছে, সেটাই একটি সুস্থ সম্পর্ক আর ক্ষতিকর সম্পর্কের মধ্যে পার্থক্য গড়ে দেয়। মানসিক সুস্থতার সাথে সম্পর্কের সুস্থতা গভীরভাবে জড়িত, এবং এ নিয়ে বিস্তারিত জানতে পারেন আমাদের মানসিক স্বাস্থ্য কী লেখাটিতে।
দাম্পত্য কলহ কেন হয়
কারণগুলো ব্যক্তিভেদে আলাদা হলেও কিছু বিষয় প্রায় সব সম্পর্কেই ঘুরেফিরে আসে। নিচে সবচেয়ে সাধারণ কারণগুলো তুলে ধরা হলো।
যোগাযোগের ঘাটতি
অনেক দম্পতি মনে করেন, সঙ্গী তাঁর মনের কথা এমনিতেই বুঝে নেবেন। কিন্তু না বলা প্রত্যাশা প্রায়ই ভুল বোঝাবুঝিতে রূপ নেয়। মন খুলে কথা বলার অভ্যাস না থাকলে ছোট বিষয়ও জমতে জমতে বড় দূরত্ব তৈরি করে।
শ্বশুরবাড়ি ও পারিবারিক প্রত্যাশার চাপ
বাংলাদেশি প্রেক্ষাপটে যৌথ পরিবার ও শ্বশুরবাড়ির প্রত্যাশা দাম্পত্য জীবনে বড় ভূমিকা রাখে। কার পরিবারকে বেশি সময় দেওয়া হচ্ছে, কে কতটা মূল্য পাচ্ছে, লোকে কী বলবে, এই ধরনের বিষয় নিয়ে চাপা টানাপোড়েন চলতে থাকে। আমাদের ক্লিনিক্যাল অভিজ্ঞতায় আমরা প্রায়ই দেখি, দুই পরিবারের মধ্যে এক ধরনের অপ্রকাশ্য প্রতিযোগিতা দম্পতির ওপর গিয়ে পড়ে, অথচ মূল সমস্যাটা দুজনের নিজেদের মধ্যে নয়।
অব্যক্ত মানসিক চাপ
অনেক সময় স্বামী-স্ত্রী যেসব ছোট ছোট বিষয়ে বারবার ঝগড়া করেন, সেগুলো আসলে মূল সমস্যা নয়। কাপ ধোয়া হয়নি, দেরিতে ফেরা, ফোনে বেশি সময় দেওয়া, এসব নিয়ে বারবার তর্ক আসলে ভেতরে জমে থাকা উদ্বেগ, ক্লান্তি বা কষ্টের বহিঃপ্রকাশ। আমরা প্রায়ই দেখি, বাইরে যেটা নিয়ে ঝগড়া, ভেতরে চাপা থাকে সম্পূর্ণ ভিন্ন এক অব্যক্ত চাপ।
আর্থিক চাপ ও দায়িত্বের ভাগাভাগি
টাকাপয়সা, খরচের সিদ্ধান্ত, কে কতটা আয় করছে বা সংসারের দায়িত্ব কীভাবে ভাগ হচ্ছে, এসব নিয়ে মতভেদ দাম্পত্য কলহের একটি বড় কারণ। বিশেষত যখন প্রত্যাশাগুলো স্পষ্টভাবে আলোচনা করা হয় না।
দীর্ঘ চাপে ঘনিষ্ঠতা কমে যাওয়া
দীর্ঘদিনের মানসিক চাপ, ক্লান্তি আর দূরত্ব দাম্পত্য ঘনিষ্ঠতাকেও প্রভাবিত করে। যখন দুজন মানুষ ভেতরে ভেতরে ক্লান্ত ও উদ্বিগ্ন থাকেন, তখন আবেগীয় ও শারীরিক নৈকট্য স্বাভাবিকভাবেই কমে আসে। এটি লজ্জার কিছু নয়, বরং জমে থাকা চাপের একটি স্বাভাবিক পরিণতি। এই দূরত্ব আবার নতুন করে বিরক্তি ও ঝগড়ার জন্ম দেয়, ফলে একটি চক্র তৈরি হয়।
কলহের এই চক্র কীভাবে তৈরি হয়
একটি অমীমাংসিত বিষয় থেকে বিরক্তি জন্মায়, সেই বিরক্তি দূরত্ব তৈরি করে, দূরত্ব থেকে আরও ভুল বোঝাবুঝি, আর সেখান থেকে আবার নতুন ঝগড়া। এভাবে ছোট একটি সমস্যা সময়ের সাথে বড় হয়ে ওঠে। এই চক্র ভাঙতে হলে ঝগড়ার উপরিভাগ নয়, বরং এর নিচে চাপা পড়া প্রকৃত অনুভূতিগুলো বোঝা দরকার।
দাম্পত্য কলহ কীভাবে মেটাবেন
সম্পর্ক মেরামত একদিনে হয় না, তবে সচেতন কিছু চেষ্টায় ধীরে ধীরে পরিবর্তন আসে। নিচের কিছু বিষয় সহায়ক হতে পারে।
- শোনার অভ্যাস গড়ুন: সঙ্গী কথা বলার সময় মনে মনে উত্তর সাজানোর বদলে সত্যিকারভাবে শোনার চেষ্টা করুন। অনেক সময় মানুষ সমাধান নয়, বোঝা হওয়ার আশ্বাস চায়।
- দোষারোপ না করে অনুভূতির কথা বলুন: “তুমি সবসময় এমন করো” না বলে “আমার খারাপ লাগে যখন এমন হয়” বলার অভ্যাস করুন। এতে সঙ্গী আত্মরক্ষার বদলে বোঝার দিকে এগোন।
- ঝগড়ার সঠিক সময় বেছে নিন: দুজনেই ক্লান্ত বা রাগান্বিত থাকলে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা এড়িয়ে চলুন। শান্ত মুহূর্তে কথা বলুন।
- প্রকৃত সমস্যাটা খুঁজুন: বারবার একই বিষয়ে ঝগড়া হলে নিজেকে প্রশ্ন করুন, আসলে কী নিয়ে কষ্ট পাচ্ছি। উপরের ঝগড়া নয়, ভেতরের অনুভূতিটা চিহ্নিত করুন।
- ছোট ছোট নৈকট্য ফিরিয়ে আনুন: একসাথে সময় কাটানো, ছোট কথাবার্তা বা সামান্য প্রশংসা সম্পর্কে উষ্ণতা ফিরিয়ে আনতে সাহায্য করে।
- সীমা নির্ধারণ করুন: পরিবারের প্রত্যাশা সামলাতে দুজন মিলে সিদ্ধান্ত নিন, যাতে বাইরের চাপ সম্পর্কের ভেতরে ফাটল না ধরায়।
সম্পর্কের দূরত্ব ও টানাপোড়েন কমানোর আরও বাস্তব কৌশল নিয়ে বিস্তারিত পড়তে পারেন আমাদের সম্পর্কের টানাপোড়েন ও দূরত্ব কমানো লেখাটিতে।
কখন psychologist-এর সাথে কথা বলবেন
কিছু ক্ষেত্রে নিজেদের চেষ্টায় সব সমস্যা মেটানো কঠিন হয়ে পড়ে। নিচের লক্ষণগুলো দেখা দিলে একজন trained psychologist বা কাউন্সেলরের সহায়তা নেওয়া ভালো সিদ্ধান্ত।
- একই বিষয়ে বারবার ঝগড়া হচ্ছে, কোনো সমাধান আসছে না।
- দুজনের মধ্যে কথা বলা প্রায় বন্ধ, দূরত্ব বেড়েই চলেছে।
- ঝগড়ার সময় কঠিন কথা, অপমান বা নিয়ন্ত্রণ হারানোর ঘটনা ঘটছে।
- দীর্ঘ সময় ধরে মন খারাপ, উদ্বেগ, ঘুম বা রুচির সমস্যা দেখা দিচ্ছে।
- সম্পর্কের চাপ দৈনন্দিন জীবন বা সন্তানের ওপর প্রভাব ফেলছে।
কাপল কাউন্সেলিং বা থেরাপিতে একজন নিরপেক্ষ psychologist দুজনকেই মন খুলে কথা বলার একটি নিরাপদ জায়গা দেন এবং প্রকৃত সমস্যাগুলো চিহ্নিত করতে সাহায্য করেন। কাউন্সেলিং আসলে কী এবং কীভাবে কাজ করে, তা জানতে পড়ুন কাউন্সেলিং কী এবং কীভাবে কাজ করে লেখাটি। এখানে বলে রাখা ভালো, মানসিক স্বাস্থ্য বা সম্পর্কের সমস্যায় ওষুধ সংক্রান্ত কোনো সিদ্ধান্ত একজন যোগ্য ডাক্তারের পরামর্শ নিতে হবে।
শেষ কথা
দাম্পত্য কলহ মানেই সম্পর্কের শেষ নয়। বরং এটি প্রায়ই এক ধরনের সংকেত, যে দুজনের মধ্যে কিছু অনুভূতি অব্যক্ত রয়ে গেছে। সহানুভূতি, ধৈর্য আর সঠিক সহায়তা দিয়ে বেশিরভাগ সম্পর্কই আবার সুস্থ ও উষ্ণ হয়ে উঠতে পারে।
আপনি যদি মনে করেন, সম্পর্কের টানাপোড়েন সামলাতে psychologist-এর সাথে কথা বলা প্রয়োজন, তবে Chum Wellness-এর licensed psychologist ও counsellor-দের সাথে গোপনীয়ভাবে কথা বলতে পারেন, অনলাইনে সারা বাংলাদেশ থেকে কিংবা ঢাকায় সরাসরি। সেশন ফি ২,০০০ টাকা থেকে শুরু, এবং শিক্ষার্থীদের জন্য রয়েছে কমানো ফি। প্রথম পদক্ষেপ নিতে আজই একটি সেশন বুক করুন।
সাধারণ জিজ্ঞাসা
দাম্পত্য কলহ কি স্বাভাবিক?
হ্যাঁ, মতভেদ ও মাঝেমধ্যে কলহ প্রায় প্রতিটি সম্পর্কেই স্বাভাবিক। দুজন আলাদা মানুষের মধ্যে মতের অমিল হতেই পারে। সমস্যা হয় তখন, যখন একই বিষয়ে বারবার ঝগড়া চলতে থাকে, কথা বলা বন্ধ হয়ে যায় বা দূরত্ব বাড়তে থাকে। কীভাবে কলহ সামলানো হচ্ছে, সেটাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
ছোট ছোট বিষয়ে বারবার ঝগড়া হয় কেন?
আমাদের ক্লিনিক্যাল অভিজ্ঞতায় আমরা প্রায়ই দেখি, ছোট বিষয়ে বারবার ঝগড়া আসলে ভেতরে জমে থাকা অব্যক্ত মানসিক চাপ, উদ্বেগ বা ক্লান্তির বহিঃপ্রকাশ। বাইরে যা নিয়ে তর্ক, ভেতরে চাপা থাকে ভিন্ন কোনো অনুভূতি। প্রকৃত সমস্যাটা চিহ্নিত করতে পারলে চক্রটি ভাঙা সহজ হয়।
কখন কাপল কাউন্সেলিং নেওয়া উচিত?
একই বিষয়ে বারবার ঝগড়া হলে, দুজনের মধ্যে কথা বলা প্রায় বন্ধ হলে, দূরত্ব বাড়তে থাকলে বা সম্পর্কের চাপ দৈনন্দিন জীবনে প্রভাব ফেললে একজন trained psychologist বা কাউন্সেলরের সহায়তা নেওয়া ভালো। psychologist-এর সাথে কথা বলায় দুজনেই মন খুলে কথা বলার নিরাপদ জায়গা পান।
শ্বশুরবাড়ির চাপে দাম্পত্য সমস্যা হলে কী করব?
পরিবারের প্রত্যাশা সামলাতে দুজন মিলে আগে থেকেই স্পষ্ট সিদ্ধান্ত নেওয়া জরুরি, যাতে বাইরের চাপ সম্পর্কের ভেতরে ফাটল না ধরায়। একে অপরের পাশে দাঁড়ানো এবং প্রয়োজনে counselling নেওয়া সহায়ক হতে পারে।
পেশাদার সহায়তার জন্য কাপল কাউন্সেলিং দেখুন, অথবা একটি সেশন বুক করুন।
আরও পড়ুন: শ্বশুরবাড়ি ও শাশুড়ির সঙ্গে মানিয়ে চলা এবং সম্পর্কে ক্ষমা করা ও এগিয়ে যাওয়া।
Talk to our psychologists
Book a confidential session with a licensed psychologist at Chum Wellness.
- Mita Rani Roy Chowdhury — Clinical Psychologist
- Ismat Jahan Nipa — Clinical Psychologist
- Farzana Sultana Nila — Clinical Psychologist

