পড়তে বসলেই বাচ্চার মনোযোগ চলে যায়? ঘরে বসে ঠিক করার উপায়

Mst. Swampa
Clinically reviewed byMst. SwampaSenior Clinical Psychologist · MS & M.Phil in Clinical Psychology (University of Dhaka) · BCPS memberLast reviewed September 2026

সন্ধ্যা হলে ঘরে ঘরে একই দৃশ্য। বাচ্চা টেবিলে বসেছে, বই খোলা, কিন্তু মন অন্য কোথাও। একটু পর পানি খেতে ওঠে, একটু পর বাথরুমে যায়, পেন্সিল ঘোরায়, জানালার বাইরে তাকিয়ে থাকে। বাবা-মা পাশে বসে বলতে থাকেন “মন দাও, মন দাও” কিন্তু কাজ হয় না। শেষে বকাঝকা, তারপর দুই পক্ষেরই মন খারাপ।

যদি এটা আপনার ঘরের গল্প হয়, জেনে রাখুন আপনি একা নন। বাচ্চার পড়ায় মনোযোগ না থাকা এই সময়ের সবচেয়ে কমন অভিভাবক-দুশ্চিন্তার একটা। ভালো খবর হলো, বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এটা “বাচ্চা দুষ্টু” বা “পড়তে চায় না” বলে নয়, বরং কয়েকটা সহজ জিনিস ঠিক করলেই অনেকটা বদলে যায়।

আগে বোঝা দরকার: বয়স অনুযায়ী মনোযোগের সময় আলাদা

আমরা অনেক সময় বাচ্চার কাছ থেকে এমন মনোযোগ আশা করি যা তার বয়সের জন্য স্বাভাবিকই না। একটা মোটামুটি হিসাব হলো, একটা শিশু একটানা মন দিতে পারে তার বয়সের প্রায় দুই থেকে তিন গুণ মিনিট। মানে ৫ বছরের বাচ্চা হয়তো একটানা ১০ থেকে ১৫ মিনিট, ৮ বছরের বাচ্চা ২০ মিনিটের মতো। এক ঘণ্টা একটানা বসে থাকবে, এই আশা করাটাই ভুল।

তাই প্রথম কাজ হলো নিজের প্রত্যাশাটা বয়সের সাথে মিলিয়ে নেওয়া। ছোট ছোট সময় ধরে পড়ানো, মাঝে বিরতি, এটাই বাচ্চার মস্তিষ্কের জন্য স্বাভাবিক।

কেন পড়তে বসলে মন বসে না

কারণ খুঁজে বের করাটা জরুরি, কারণ সমাধান কারণের ওপরই নির্ভর করে। সবচেয়ে কমন কারণগুলো:

  • স্ক্রিনের অভ্যাস: মোবাইল আর ইউটিউব বাচ্চার মস্তিষ্ককে দ্রুত, রঙিন, সাথে সাথে মজা দেওয়া জিনিসে অভ্যস্ত করে ফেলে। এর পাশে বই ধীর আর “বোরিং” লাগে, মন টেকে না।
  • ঘুম আর খাওয়া: কম ঘুম বা খালি পেট মানেই কম মনোযোগ। ক্লান্ত বা ক্ষুধার্ত বাচ্চা কিছুতেই মন দিতে পারে না।
  • পড়ার পরিবেশ: টিভি চলছে, পাশে ফোন, ভাইবোন খেলছে, এমন জায়গায় মন দেওয়া বড়দের জন্যও কঠিন।
  • মনের চাপ বা দুশ্চিন্তা: পরীক্ষার ভয়, রেজাল্টের চাপ, বা স্কুল নিয়ে কোনো চিন্তা থাকলে মন পড়ায় বসে না। মাথায় অন্য জিনিস ঘুরতে থাকে।
  • রুটিন না থাকা: প্রতিদিন একেক সময় পড়তে বসলে শরীর-মন কখনো “পড়ার মুড”-এ ঢুকতে শেখে না।
  • বিষয় বোঝায় সমস্যা: যে অংশটা বাচ্চা বোঝে না, সেটা এড়িয়ে যেতে চায়। তখন “মন বসছে না” আসলে “কঠিন লাগছে”।

ঘরে বসে যা করতে পারেন: মনোযোগ ধরে রাখার বাস্তব উপায়

১. ছোট ছোট স্লটে পড়ান, মাঝে ব্রেক দিন

এক টানা এক ঘণ্টা নয়। ২০ থেকে ২৫ মিনিট পড়া, তারপর ৫ মিনিট ব্রেক। এই ব্রেকে একটু হাঁটা, পানি খাওয়া, একটু নড়াচড়া। ছোট লক্ষ্য বাচ্চার কাছে সহজ মনে হয়, আর শেষ করতে পারলে ভালো লাগে।

২. পড়ার জন্য একটা আলাদা, শান্ত জায়গা বানান

একই জায়গায়, একই টেবিলে রোজ পড়তে বসলে মস্তিষ্ক জায়গাটাকে “পড়ার জায়গা” হিসেবে চিনে নেয়। টেবিলে যেন শুধু দরকারি জিনিস থাকে, খেলনা বা ফোন নয়। আশপাশে টিভি বা জোরে আওয়াজ বন্ধ রাখুন।

৩. পড়ার আগে স্ক্রিন থেকে একটু দূরত্ব

পড়তে বসার ঠিক আগে মোবাইল বা কার্টুন দেখলে মস্তিষ্ক তখনো ওই দ্রুত মজায় আটকে থাকে, বই ধীর লাগে। পড়ার অন্তত আধা ঘণ্টা আগে স্ক্রিন বন্ধ রাখলে মন সহজে থিতু হয়।

৪. প্রতিদিন একই সময়ে পড়ার রুটিন

রোজ একই সময়ে পড়তে বসলে সেটা অভ্যাসে দাঁড়ায়। তখন প্রতিদিন নতুন করে “পড়তে বসো” নিয়ে যুদ্ধ করতে হয় না, শরীর নিজেই জানে এখন পড়ার সময়।

৫. বকা নয়, ছোট ছোট উৎসাহ

“তুমি তো কিছুই পারো না” এই কথা মনোযোগ বাড়ায় না, বরং পড়ার সাথে ভয় জুড়ে দেয়। এর বদলে ছোট অর্জনে প্রশংসা করুন, “আজকে পুরো ২০ মিনিট বসে থেকেছ, দারুণ”। বাচ্চা যখন দেখে চেষ্টা করলে বাহবা পায়, তখন আবার চেষ্টা করে।

৬. শুরুর দিকে পাশে থাকুন

ছোট বাচ্চার ক্ষেত্রে প্রথম কয়েক দিন পাশে বসে থাকা সাহায্য করে, তবে তার হয়ে পড়া নয়। ধীরে ধীরে নিজে থেকে করতে দিন, যেন সে নিজের ওপর ভরসা করতে শেখে।

কখন এটা শুধু “মনোযোগ না থাকা” নয়

বেশিরভাগ বাচ্চার ক্ষেত্রে ওপরের উপায়গুলোতেই কাজ হয়। কিন্তু কিছু ক্ষেত্রে মনোযোগের সমস্যা আরও গভীর কিছুর লক্ষণ হতে পারে। খেয়াল করুন যদি:

  • শুধু পড়া নয়, খেলা বা টিভিসহ কোনো কাজেই একটানা মন দিতে পারে না।
  • খুব অস্থির, একজায়গায় বসে থাকতে পারে না, খুব বেশি নড়াচড়া করে।
  • বারবার বলা সত্ত্বেও নির্দেশ মনে রাখতে বা শেষ করতে পারে না।
  • পড়া বা স্কুল নিয়ে অতিরিক্ত ভয়, কান্না বা পেটব্যথা-মাথাব্যথার অভিযোগ।

এমন হলে এর পেছনে মনোযোগের সমস্যা (ADHD), শিশুর দুশ্চিন্তা, বা শেখার কোনো নির্দিষ্ট অসুবিধা থাকতে পারে। এগুলো বকা দিয়ে ঠিক হয় না, বরং সঠিক মূল্যায়ন আর সাহায্য দরকার।

কখন বিশেষজ্ঞের সাহায্য নেবেন

বাসায় কয়েক সপ্তাহ চেষ্টার পরও যদি তেমন বদল না আসে, বা বাচ্চার আচরণ নিয়ে আপনার মনে হয় কিছু একটা ঠিক নেই, তাহলে একজন সাইকোলজিস্টের সাথে কথা বলাই ভালো। একটা পেশাদার মূল্যায়নে বোঝা যায় সমস্যাটা রুটিনের, নাকি এর পেছনে অন্য কিছু আছে। যত আগে বোঝা যায়, তত সহজে সমাধান হয়।

Chum Wellness-এ শিশু ও কিশোরদের নিয়ে কাজ করেন এমন সাইকোলজিস্টরা আছেন, যাদের সাথে আপনি অনলাইনে বা সরাসরি, গোপনীয়তা রক্ষা করে বসতে পারেন। অনলাইন কাউন্সেলিং সম্পর্কে জানুন, অথবা সরাসরি একটা সেশন বুক করুন।

সাধারণ কিছু প্রশ্ন

বাচ্চার পড়ায় মনোযোগ বাড়াতে কত সময় লাগে?

রুটিন আর পরিবেশ ঠিক করলে সাধারণত কয়েক সপ্তাহের মধ্যে পার্থক্য চোখে পড়ে। তবে এটা এক দিনে হয় না, ধৈর্য আর ধারাবাহিকতাই আসল।

পড়ার সময় মোবাইল কি একদম বন্ধ রাখা উচিত?

হ্যাঁ, পড়ার জায়গা থেকে মোবাইল দূরে রাখাই ভালো। এমনকি টেবিলে থাকা বন্ধ ফোনও মনোযোগ কমায়, কারণ মন বারবার ওদিকে যায়।

বকা দিলে কি মনোযোগ বাড়ে?

না। বকা বা তুলনা পড়ার সাথে ভয় আর চাপ জুড়ে দেয়, যা উল্টো মনোযোগ কমায়। ছোট উৎসাহ আর সহানুভূতি অনেক বেশি কাজ করে।

আরও পড়ুন: শিশুর স্ক্রিন টাইম ও মানসিক স্বাস্থ্য এবং পরীক্ষার চাপ সামলানোর উপায়

Trusted resources
Further reading from leading global health authorities:

Keep Reading

ইন্ট্রোভার্ট (Introvert) মানে কি? অন্তর্মুখী মানুষের বৈশিষ্ট্যইন্ট্রোভার্ট (Introvert) মানে কি? অন্তর্মুখী মানুষের বৈশিষ্ট্যটক্সিক রিলেশনশিপ (Toxic Relationship) মানে কি? লক্ষণ ও করণীয়টক্সিক রিলেশনশিপ (Toxic Relationship) মানে কি? লক্ষণ ও করণীয়গ্যাসলাইটিং (Gaslighting) মানে কি? লক্ষণ, সম্পর্কে প্রভাব ও করণীয়গ্যাসলাইটিং (Gaslighting) মানে কি? লক্ষণ, সম্পর্কে প্রভাব ও করণীয়

Talk to our psychologists

Book a confidential session with a licensed psychologist at Chum Wellness.

Mst. Moslema Afruzzahan
Mst. Moslema AfruzzahanAssistant Clinical Psychologist & Psychotherapist · 10+ yearsFrom ৳2,500ProfileBook
Saima Akther Jui
Saima Akther JuiClinical Director · 11+ yearsFrom ৳2,500ProfileBook
Farah Tabassum Shamma
Farah Tabassum ShammaAssistant Clinical Psychologist · 7+ yearsFrom ৳2,500ProfileBook
See all psychologists →